বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর

প্রফেসর জাহান আরা বেগম

প্রকৃতগতভাবেই মানুষ সমাজবদ্ধ। তাই তাদের আনন্দ বেদনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, পাওয়া না পাওয়া সব কিছুরই ভাগ দিতে চায় অপরকে। আর এই চাওয়া পাওয়া আনন্দ বেদনার আদান প্রদানের মাধ্যমই হয়ে ওঠে সংস্কৃতি। আর মনের ভাব প্রকাশ করার পরিশীলিত লেখা মাধ্যমই হয়ে ওঠে  সাহিত্য । সাহিত্য আর সংস্কৃতি একে অন্যের পরিপূরক, আর এর মূখ্য উপলক্ষই হল মানুষ।

সৃষ্টির আদি থেকেই মানুষে মানুষে বৈষম্য ছিল। বড় বড় মনীষীরা এই বৈষম্যকে ভেঙ্গে দিতে চেষ্টা করেছেন নানা মাত্রিকতায়। কখনো ধর্ম এই ভেদাভেদ ভুলে এক হওয়ার আহবান জানিয়েছে-কখনোবা অন্যকোনো ব্যবস্থাপনায়। তবে মানুষ ধর্মীয় সামাজিক সব অনুশাসনের বাধা অতিক্রম করে নিজেদের স্বাভাবিক আনন্দ উল্লাস করে এসেছেন সেই প্রাচীন কাল থেকেই। ধর্মের বন্ধন অনুশাসন মানুষ থেকে আলাদা করেছে আবার তেমনি  ধর্মের প্রসারতা, গভীরতা মানুষকে মানুষের মধ্যকার ভেদাভেদ ভুলতে সাহায্য করেছে।

বাংলাদেশের ঈদ উৎসবের ইতিহাস কবে থেকে শুরু তা এখনো তেমন করে জানা যায়নি, তবে নানা ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও সূত্র থেকে বাংলাদেশে রোজা পালন এবং ঈদ উল ফিতর বা ঈদ উল আজহার খবর পাওয়া যায়। তবে দেখা যায় ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গদেশে মুসলিম অধিকার এলেও এদেশে নামাজ রোজা ঈদ উদযাপন এগুলো অনেক আগে থেকেই চলে এসেছে, অবশ্য তাতে আশ্চর্য্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ এদেশ যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে মুসলিম অধিকারে আসার আগে থেকেই মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে মুসলমান সুফি, দরবেশ ও ধর্ম প্রচারকরা বাংলাদেশে আসেন। এদের অনেকেই উত্তর ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসেন, অন্যদিকে আরবীয় ও অন্যান্য মুসলিম দেশের সওদাগর বণিকেরা চট্রগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বাংলার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এই বহিরাগত মুসলমান বণিক ধর্মসাধক ও ইসলাম প্রচারকরা নিজস্ব পরিমণ্ডলে, তাদের প্রধান ধর্মীয় পরিমণ্ডলে পর্ব হিসাবে ঈদ পালন করতেন, তখন তাদের ঈদ উদযাপন ছিল সীমিত গণ্ডিবদ্ধ তবে বাংলাদেশে ঈদ উৎসবের ভিত্তি হিসাবে এর গুরুত্ব একেবারে কম নয়, মুসলিম ইতিহাস ঐতিহ্য ধর্মীয় উৎসব তথা সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলার পরিচয়ের ক্ষেত্র তিনটি:

ক. উত্তর ভারত হয়ে আসা মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক ।

খ. চট্রগ্রাম নৌবন্দরের মাধ্যমে আগত বণিকদের সাথে সম্পর্ক

গ. বহিরাগত মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ এর সঙ্গে পরিচয়

শিক্ষিত ও বিত্তবান মানুষই সাধারণত ভিন্ন পরিবেশের সংস্পর্শে মেলামেশার ফলে তাদের দৃষ্টিভঙ্গীতেও পরিবর্তন আসে, তারা কতক পরিমানে কসমোপালিটান এবং বিশ্বের প্রভাবশালী ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে পরে এবং তাদের জীবনাচরণ ও বিশ্বদৃষ্টিতে নানা সংস্কৃতির মিশ্রন ঘটে, যা নি¤œ বিত্ত ও নিরক্ষর মানুষের ক্ষেত্রে তা সাধারণত ঘটেনা ।

ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ও সপ্তদশ শতকের কবি ভারত চন্দ্রের কবিতায় মুসলমানদের ‘রোজা’ পালন সম্পর্কে সুস্পষ্ট প্রমান পাওয়া যায় । ঢাকা শহরে রোজার এবং ঈদ উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায় মির্জা নাথান এর বইয়ে । ঈদের দিনে মুঘল সেনা ছাউনীতে যেসব রীতি চালু ছিল তার বিবরণ এই বইয়ে আছে। মোঘলরাই এসব রীতি চালু করেন ঢাকা শহরে। মুবারিজ খা নামক কোন এক মোঘল কর্মচারী রোজা শেষে এক বিরাট ভোজের আয়েজন করেছিলেন। এতে সৈন্য সামন্ত সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি যোগদান করেন, ঈদের চাঁদ দেখাও ছিল এক আনন্দময় ব্যাপার। চাঁদ দেখার পরে তোপধ্বনির  মাধ্যমে মানুষকে জানানো হতো আরো দূরের মানুষদের জানানোর জন্য কামান দাগানো হতো।

বাংলার সুবাদার শাহ সুজার নির্দেশে তাঁর প্রধান আমত্য মীর আবুল কাশেম ১৬৪০ সালে ঢাকার ধানমন্ডী এলাকায় একটি ২৪৫ ফুট দৈঘ্য ও ১৩৭ ফুট প্রস্ত এবং ভূমি থেকে বারো ফুট উচ্চতায় একটি ঈদগাহ্ নির্মান করেন।

ঈদ উল ফিতর এখন বহু উপমায় সজ্জিত, বাঙ্গালির উৎসবের তালিকায় এখন এ উৎসব শুধু মুুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ক্রমশ সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। কৃষি ভিত্তিক বাংলার এই উৎসবে এখন দেখা যায় ঈদ আনন্দ মেলা, হাডুডু খেলা, ষাড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, লাঠি খেলা, নৌকা বাইচ ইত্যাদি ।

বাংলার সংস্কৃতিতে যতটা আড়ম্বরপূর্নভাবে ঈদ উৎসব প্রচারিত হয়ে আসছে সে তুলনায় সাহিত্য ক্ষেত্রে ঈদ উপলক্ষে লেখা খুবই কম। এ প্রসঙ্গে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান, কবিতা উল্লেখযোগ্য, কবি গোলাম মোস্তফা, বেনজির আহমদ, কবি সুফিয়া কামাল, জসীম উদ্দীনের লেখায় সামান্য দু’একটি কবিতা পাওয়া যায়, তবে ঈদের জন্য বিশেষ সাময়িকীতে ছড়া, কবিতা, ছোট গল্পের প্রকাশ পাওয়া যায় ।

ঈদ উৎসব ব্যবসায়িক মাত্রা পাওয়ায় ইদানিং বহু পত্র-পত্রিকায় বিশেষ ঈদ সংখ্যা প্রচারিত হয় কিন্তু তাতে বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে লেখা থাকলে ও ঈদ বিষয়ক লেখা থাকেনা বললেই চলে ।

এ প্রসঙ্গে প্রথম বেতারে প্রচারিত ঈদ উৎসবের কথা উল্লেখ না করলেই নয়, যে অনুষ্ঠানের সাথে জড়িয়ে আছে কাজী নজরুল ইসলামের  বিখ্যাত গান ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খশির ঈদ’ এর জন্ম বৃত্তান্ত ।

১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বেতারে প্রচারিত হয়েছিল ঈদ অনুষ্ঠানে। বেতার কর্মকর্তাদের দীর্ঘ দিনের সুষ্ঠু পরিকল্পনা আর আগ্রহে এটি সার্থকভাবে প্রচারিত হতে পেরেছিল। কোলকাতা বেতার কেন্দ্রের প্রধান নৃপেন বন্দ্যোপাধ্যায় ঈদ অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা করেন।

কাজী নজরুল ইসলামের ডাক পরলো অনুষ্ঠান পরিচালনা করার জন্য কিন্তু নজরুল তখন তাঁর ‘আলেয়া’ নাটকের মহড়া নিয়ে মহাব্যস্ত। এসময় কবি গোলাম মোস্তফা, কবি শাহাদাৎ হোসেন, আশরাফ উজ-জামান খান এরা এলেন, কবিকে অনুরোধ করলেন কবি ব্যস্ততা সত্ত্বেও নিরুপায় হয়ে লিখে দিলেন অমর গান ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে ’ কবিতা ‘ঈদ উল ফিতর’।  সিদ্ধান্ত হল এগানে কন্ঠদেবেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ, প্রাণবন্ত এই সজিব অনুষ্ঠানটিই বেতারের প্রথম সার্থক ঈদ অনুষ্ঠান ।

নজরুলের ঈদের গানটি যেমন জনপ্রিয়, তেমনি কবিতাও একটি নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে ।

‘ঈদ উল ফিতর আনিয়াছে তাই নব বিধান

ওগো সঞ্চয়ী, উদ্বৃত্ত যা করিবে দান

ক্ষুধার অন্ন থেকে তোমার

ভোগের পেয়ালা উপচায়ে পড়ে তব হাতে,

তৃষ্ণাতুরের হিস্সা আছে ও পেয়ালাতে

দিয়া ভোগ কর বীর দেদার। ’

 

লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, সরকারি বিএম কলেজ, বরিশাল

Next Barisal banner ads

One comment

Leave a Reply to খৈয়াম আজাদ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *