‘ব্রিটিশ আমলে মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষা থেকে দূরে ছিলো’

শতাব্দীর সেরা এক মিথ্যাচারের জবাব

মাহমুদ ইউসুফ

বরিশাল থেকে প্রকাশিত শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক সাময়িকীর সম্পাদক সাহেব একদিন জানালেন, মুক্তবুলির পরবর্তী সংখ্যা হবে ইতিহাস ঐতিহ্যভিত্তিক। এ বিষয়ে তিনি লেখা দাবি করে বসলেন। আমি বলেই ফেললাম ‘আমার লেখা কেউ ছাপাতে চায় না। দিয়ে কী করব?’ বিশ্ববরেণ্য সাংবাদিক ও সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের কথাও স্মরণ করিয়ে দিলাম। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে এমন কোনো কাগজ নেই, যে আমার লেখা প্রকাশের সাহস রাখে।’ সম্পাদক মহোদয় অতঃপর বললেন, আগে লেখা দিন, দেখি! তথ্যভিত্তিক হলে ছাপাবার চেষ্টা করব।

আমিও অনেক ভেবে-চিন্তে অতীব জরুরি একটি বিষয় নির্বাচন করলাম। বিষয়টি বর্তমান বৈরি পরিবেশে সময়োপযুগীও বটে। তবে কেউ কেউ হয়ত বলবেন, বিষয়টির সাথে সাহিত্য-সংস্কৃতির রিশতা কী? শিল্প-সাহিত্য সংক্রান্ত কাগজে এ লেখা কেন? কিন্তু আমি বলব, বিষয়টি আমাদের জীবন ও অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত। তাই এটি সংস্কৃতির সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি সাংস্কৃতিক সাময়িকীর উপযোগী।

বাংলাদেশের লোকসমাজে একটি মিথ প্রচলিত আছে। এলিট সোসাইটিতে তা প্রবাদতুল্য। তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও প্রগতিবাদীরা বিষয়টি প্রচার করে খুবই আনন্দ পান। ‘সুশীল সমাজ’ ও ‘বিশিষ্ট নাগরিকরা’ এ বিষাক্ত আগুনে আওয়ারা। সেকুলার-বাম-রামরা এর বিস্তার ও প্রসারে লিপ্ত। বহুমুখি আগ্রাসনে মিথটি মহামারীরূপে আবির্ভূত বাঙালি সমাজে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে উপরিউক্ত শ্রেণিসমূহ এই বিষয়টি বলেই যাচ্ছে, আর আমরাও শুনেই যাচ্ছি। বক্তারা এক্ষেত্রে উচ্ছ্বসিত আর শ্রোতারা তাদের ক্যারিকেচার হজম করছে এবং পূর্বপুরুষদের দায়ী করে গালমন্দ করছে। ও! আচ্ছা! এতক্ষণ পর্যন্ত পাঠকদের বিষয়টিই বলা হয়নি। পাঠকরা হয়ত ভাবতে পারেন- লোকটা শুধুই বকবক করছে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে। কেউ আবার বলতে পারেন এসব বয়ান প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। আর দেরি নয়। বিষয়টি এবার বলেই ফেলি। সবারই জানা, সবারই শোনা, সবারই মুখস্থ। ‘ব্রিটিশ আমলে ইচ্ছাকৃতভাবেই গোয়ার্তুমীর বশর্বতী হয়ে মুসলিমরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে নাই।’

আসল কথা হলো: ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ না করার পিছনে মুসলিমরা মোটেও দায়ী নয়। তারপরও এটা কীভাবে প্রচার পেল? কারা, কেন জনতার কানে এই বিষ ঢেলে দিল? সে বিষয়ে সম্যক অবহিত হওয়া সকলের নৈতিক দায়িত্ব। বিষয়টি উপলব্ধি করা খুবই সহজ। কলকাতাকেন্দ্রিক বর্ণহিন্দুরা নিজেদের সাম্প্রদায়িকতা, অপকর্ম ও মুসলিম দলন-নিগ্রহ-নিপীড়নের চিত্র গোপন করতেই এই অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। খবরের কাগজ ছিলো তাদের প্রধান সহযোগী। যারে দেখতে না পারি তার চলন বাঁকা। প্রতিপক্ষের চরিত্র হননই মিডিয়ার মূল দয়িত্ব। ইসলামের ছিদ্রান্বেষ করাই অধিকাংশ মিডিয়া মুঘলদের নেশা পেশা। গণেশদের ঘূর্ণাবর্তে গুম গণতন্ত্র। এখন আমরা দেখব, তারা কীভাবে মুসলিমদের শিক্ষা ও জ্ঞানার্জন থেকে বঞ্চিত করছে। এই নিবন্ধের মাধ্যমে পাঠকরা ভুল প্রচারণার শানে নুযুল সম্পর্কে জানতে পারবেন।

১. মুসলমানদের জমিদারি কেড়ে নেয়া হয়
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দ্বারা পরিকল্পিতভাবে লর্ড কর্নওয়ালিস মুসলিম জমিদারি উচ্ছেদ করে এবং তৎপরিবর্তে হিন্দু নায়েব ও গোমস্তাদেরকে জমিদার হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন। ফলে মুসলিমরা দিন দিন ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। সুযোগ সুবিধা হারিয়ে কর্পদকশূণ্য হয়ে উচ্চশ্রেণির মুসলিমরা গ্রামাঞ্চলে সরে যায়। অথচ উপমহাদেশে শহর, বন্দর, গঞ্জ মুসলিমরাই গোড়াপত্তন করেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আগে গোমস্তরা ছোটোখাটো স্তরের কাজে নিযুক্ত ছিলো। নতুন ব্যবস্থায় তারা সবাই জমিদারি বনে যায়। জমির মালিকানা স্বত্ত্ব লাভ করে এবং ধন-দৌলতের অধিকারী হয়। দ্বিবিধ উদ্দেশ্যে ব্রিটিশরা এ সিদ্ধান্ত নেয়: ১. মুসলিম জমিদারদের সরিয়ে হিন্দু জমিদার পয়দা, ২. শিল্প বিপ্লব বাংলাদেশে না হয়ে যাতে ইংল্যান্ডে ঘটে। ঐতিহাসিক মোহাম্মাদ আবদুল মান্নান লিখেছেন, ‘১৭৯৩ সালে কর্ণওয়ালিস জমিদারদের সাথে রাজস্বের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করেন। সেই সাথে সূর্যাস্ত আইন যুক্ত হয়। জমিদাররা একটি নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে রাজস্বের নির্ধারিত অংশ জমা দিতে ব্যর্থ হলে সূর্যাস্তের সাথে সাথে সরকার তার জমিদারী নীলামে বেচে দেয়ার অধিকারী হয়। এই নতুন ব্যবস্থার ফলে পুরনো জমিদাররা ধ্বংস হয়। তাদের জমিদারী নীলামে কিনে রাতারাতি জমিদার হলো সদ্য ধনী হওয়া দালাল-বেনিয়ান-মুৎসুদ্দির দল।’ [বঙ্গভঙ্গ থেকে বাংলাদেশ, পৃ ৬৬]
ইংরেজরা শুরুতেই মুসলিমদের আর্থিক শক্তিকে পয়মাল করে দেয়। অর্থনৈতিকভাবে ইসলাম অনুসারীদের পঙ্গু করতে হিন্দুদের সখ্য বানিয়ে ভয়ঙ্কর সব পদক্ষেপ গ্রহণ করে ফিরিঙিরা। মুসলিমদের অর্থেই ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব ঘটে, ভারতে যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে সরকার এবং হিন্দু সম্প্রদায় সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে। উপমহাদেশের বিখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সাবেক মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ ব্রিটিশ আমলে মুসলিম সম্প্রদায়ের অবস্থান সম্পর্কে লিখেছেন, ‘বাংলার জমিদার হিন্দু, প্রজা মুসলমান; বাংলার মহাজন হিন্দু, খাতক মুসলমান; উকিল হিন্দু, মক্কেল মুসলমান; ডাক্তার হিন্দু, রোগী মুসলমান; হাকিম হিন্দু, আসামি মুসলমান, খেলোয়ার হিন্দু, দর্শক মুসলমান, জেলার হিন্দু, কয়েদি মুসলমান। … বাংলার হিন্দুদের ঘরে ঘরে যত টাকা আছে সব টাকা মুসলমানের। মুসলমান চাষী-মজুরের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করা টাকায় হিন্দুরা সিন্দুক ভরেছে, দালান ইমারত গড়েছে; গাড়ি ঘোড়া দৌঁড়াচ্ছে।’ [আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃ ১২৫-১২৬] তৎকালীন সময়ে বর্তমানের মতো শিক্ষা গ্রহণ এত সহজলভ্য ছিলো না। ছিলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দরিদ্র, হতাশাগ্রস্ত, নির্যাতিত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে তাই ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ ছিলো আকাশ কুসুম কল্পনা।

২. মুসলিমদের ব্যবসা বাণিজ্য কেড়ে নেয়া হয়
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যনীতি অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্য উভয়ক্ষেত্র থেকে মুসলিমদের বিতাড়ন করা হয়। মুসলিম আমলে বড় বড় ব্যবসাগুলোর প্রায়ই ছিলো মুসলিমদের হাতে। পারস্য সাগর ও আরব সাগরের উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো পর্যন্ত ব্যবসা-বাণিজ্য মুসলিমদের একচেটিয়া আয়ত্বে ছিলো। কোম্পানির সওদাগররা শাসকদের কাছ থেকে শুল্কমুক্ত সুযোগ-সুবিধা ও পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে মুসলিম ব্যবসায়ীদের উৎখাত করে। অন্যদিকে সারা দুনিয়াতে যশখ্যাতি জুড়ানো উন্নতিশীল মসলিন বয়নশিল্পও ধ্বংস করে ব্রিটিশরা। এভাবেই চলে মুসলিম মিসমারের খেলা। ব্রিটিশ সিভিলিয়ান উইলিয়াম হান্টার লিখেছেন, ‘একশ সত্তর বছর আগে বাংলার কোন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তানের দরিদ্র হয়ে পড়া ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু বর্তমানে তার পক্ষে ধনী হওয়াটাই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’ [দি ইন্ডিয়ান মুসলিমস,পৃ ১৩৭] এখন বলুন যাদের অর্থবিত্ত, সহায়-সম্পদ, জমি-জিরাত এমনকি মুখের গ্রাসটাও কেড়ে নেয়া হয়েছে, তারা কীভাবে শিক্ষার দিকে পা বাড়াবে?

৩. মুসলিমদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দরজা রুদ্ধ
ভারতীয় ঐতিহাসিক সুরজিৎ দাশগুপ্ত লিখেছেন, ‘কলকাতার হিন্দু কলেজের দ্বার শুধু মুসলিমদের জন্য নয়, নিম্নবর্ণের হিন্দুদের জন্যও রুদ্ধ ছিল এবং বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এই কলেজে বহুল পরিমাণে মুসলিম বিরোধী মনোভাব বজায় রেখেছে; কিন্তু সৈয়দ আহমেদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কলেজের দ্বার প্রথম থেকেই সব ধর্মাবলম্বীদের জন্য ছিল অবারিত। প্রতিষ্ঠার সাত বছর পরে স্যার উইলিয়াম হান্টার যখন এই কলেজ পরিদর্শন করল, তখন সেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছাত্রের সংখ্যা সাতান্ন।’ [ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পৃ ২১৩-২১৪] দুই সম্প্রদায়ের উদারতা, অনুদারতা, মনমানসিকতা, চিন্তাচেতনা, সুরজিৎ সাহেব খোলাখুলিই বলে দিয়েছেন।
কলকাতা এশিয়াটক সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ড. অমলেন্দু দে ‘বাঙালী বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ’ কিতাবে লিখেছেন, ‘১৮১৭ খ্রীষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজের দুয়ার মুসলমান ছাত্রদের জন্য বন্ধ ছিল।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘সংস্কৃত কলেজে [(১৮২৪ সনে প্রতিষ্ঠিত) ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য ছাড়া অন্য কোন ছাত্র ভর্তি হতে পারত না, আর মুসলমানদের ছেলে ভর্তি হওয়ার তো কথাই ছিল না।’ ১৮৫৭ সনে যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কায়েম হয় তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলো ২৪৪ জন। তাদের সবাই উচ্চবর্ণের হিন্দু। তখন একটি সাময়িকীতে মন্তব্য করা হয়, ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হল হিন্দু বিশ^বিদ্যালয়। এ বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগেই হিন্দু প্রাধান্য বিদ্যমান। যখন সরকারি বৃত্তি বণ্টনের দায়িত্ব হিন্দুদের ওপর অর্পিত হয় তখন তারা প্রতিভাসম্পন্ন মুসলমান ছাত্রদের বঞ্চিত করে সেসব বৃত্তি হিন্দু ছাত্রদের মধ্যে বণ্টন করেন। সুতরাং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিন্দুদের প্রাধান্য স্থাপন মুসলমানদের অগ্রগতির পথে অন্তরায়।’ [নবনূর, অগ্রহায়ণ সংখ্যা, ১৯০৩] এমনকি নামজাদা ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ পর্যন্ত ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বাধার কারণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ব্যর্থ হন। এসব কী মুসলিমদের একগুঁয়ে মনোভাব, শিক্ষা অবহেলা না বিদ্যা বিদ্বেষ? বিচারের ভার পাঠকদের ওপর রইল।

কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহকর্মী এম আর আখতার মুকুল লিখেছেন, ‘১৮৪৬ সাল থেকে পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যবর্তী সময়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে একজন মুসলমান ছাত্রও ভতি হতে পারেনি।’ তিনি আরও বলেছেন ‘আসলে কোলকাতা কেন্দ্রিক বর্ণহিন্দু মধ্যশ্রেণী ও বুদ্ধিজীবী নেতৃবৃন্দ নিজেদের শ্রেণী স্বার্থে এতোই নিমগ্ন ছিলেন যে, এঁরা বঙ্গীয় এলাকার মুসলমানদের কোন হিসাবের মধ্যে নেয়া তো দূরের কথা, এঁদের অগ্রগতির পথে প্রায়শঃই বাধার সৃষ্টি করেছেন।’ [কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী, পৃ ১৭০] ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার প্রথম শিক্ষা সচিব এবং অর্থমন্ত্রী [১৯৭৪-১৯৭৫] ড. আজিজুর রহমান মল্লিক লিখেছেন, ‘১৮৫৫ এবং ১৮৫৬ খ্রীস্টাব্দে পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র শর্মার অধীনে কলকাতা ও হুগলিতে স্থাপিত দুটি সরকারি মঞ্জুরি প্রাপ্ত স্কুলে একজনও বাঙালি মুসলমান ছাত্র ভর্তি হতে সক্ষম হননি। কারণ একটাই এবং তা হচ্ছে ভর্তির জন্য নির্দিষ্ট পরীক্ষার ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় ভর্তিচ্ছু ছাত্রদের যে তিনটি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হত তা হচ্ছে: ১) সীতা বৌদ্ধ শকুন্তলা, ২) বেতাল পঞ্চবিংশতি, ৩) সংস্কৃত ব্যাকরণ উপক্রমণিকা। ফলে সরকারি মঞ্জুরি প্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও আলোচ্য স্কুলগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই বাঙালি মুসলমানদের জন্য দরজা বন্ধ হয়ে গেল।’ হাজি মুহাম্মাদ মহসিন ফান্ডের অর্থে ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হুগলি স্কুল ও হুগলি কলেজেও মুসলিম ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। মোটকথা সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নানা বিধিনিষেধের আড়ালে মুুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির সকল পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়। যারা মুসলিমদের শিক্ষার পথ বন্ধ করে দেয়, তারাই আবার প্রচার করছে, ‘মুসলমানরা আধুনিক শিক্ষা পরিত্যাগ করে পশ্চাতগামী হয়ে পড়ে।’

৪) সরকারি চাকরিতে মুসলিম নিষিদ্ধ:
ইংরেজ-হিন্দু চক্রান্তে সংঘটিত পলাশি নাটকের পর ক্রমান্বয়ে প্রশাসন, বিচার, আইনশৃঙ্খলা সেনা বাহিনীসহ সকল স্তর থেকে মুসলিমদের ছাটাই করতে থাকে। তদস্থলে হিন্দুদের নিয়োগ দেয়া হয়। ফলে সবদিক থেকেই মুসলিমদের আয়-উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৬৯ সনে কলকাতার একটি কাগজে প্রকাশিত সংবাদ তুলে ধরছি। সেখানে লেখা হয়, ‘উচ্চস্তরের বা নি¤œস্তরের সকল চাকরি ক্রমান্বয়ে মুসলমানদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে, বিশেষ করে হিন্দুদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। সরকার সকল শ্রেণির প্রজাকে সমান দৃষ্টিতে দেখতে বাধ্য; তথাপি এমন সময় এসেছে যখন মুসলমানদের নাম আর সরকারি চাকরিয়াদের তালিকায় প্রকাশিত হচ্ছে না; কেবল তারাই চাকরির জায়গায় অপাঙক্তেয় সাব্যস্ত হয়েছে। সম্প্রতি সুন্দরবন কমিশনারের অফিসে কতিপয় চাকরিতে লোক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, কিন্তু অফিসারটি সরকারি গেজেটে কর্মখালীর যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন তাতে বলা হয় যে, এই শূণ্য পদগুলোতে কেবলমাত্র হিন্দুদের নিয়োগ করা হবে।’ [দূরবীন, জুলাই ১৮৬৯] জমিদারি নেই, চাকরি নেই, তেজারতি নেই, চেয়ার নেই, ক্ষমতা নেই, ঘর নেই, অর্থ-বিত্ত নেই, পেটে ভাত নেই- তাহলে শিক্ষার সুযোগ কোথায়?

ব্যতিক্রম:
তবে ব্যতিক্রম কিছু লোক তখনও ছিলো, এখনও আছে। বর্তমানেও কওমি লাইনে কিছু মানুষ আছেন যারা পাশ্চাত্য ও ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করতে অপারগ। তারা মাদরাসায় আরবি, উর্দু, ফারসি শিক্ষা দেয় অনুগত ছাত্র-ছাত্রীদের। অতীতেও এরূপ লোকের অভাব ছিলো না। তবে সেটা মূলধারা নয়। তারা আমাদের সমাজের বিচ্ছিন্ন একটি অংশ। তবে তারও একটি কারণ ছিলো। যে উদ্দেশ্যে ইংরেজি শিক্ষা উপমহাদেশে চালু করে ব্রিটিশরা তা হলো: ‘যার বর্ণ এবং রক্ত ভারতীয়দের, কিন্তু রুচি, অভিমত, নীতিবোধ, এবং বুদ্ধিশীলতা ইংরেজের।’ ইংরেজ প্রশাসক ট্রেভেলিয়ান এবং লর্ড মেকলে ছিলো এ তত্ত্বের উদগাতা। মূলত বিলাত সরকার উপমহাদেশের অধিবাসীদের বিকলাঙ্গ করতেই জন্য বিতর্কিত শিক্ষানীতি প্রবর্তন করেন। এই পরিস্থিতিতে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ওই ক্ষুদ্রশ্রেণি পশ্চিমা শিক্ষার প্রতি তেমন আগ্রহ দেখায় নি। তাই বলে তারা কাউকে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে বাঁধার সৃষ্টি করেনি। বর্ণ হিন্দুরাই ছিল আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের প্রধান প্রতিবাহক আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদীরাই মুসলিমদের অনগ্রসরতা, পশ্চাতপদতা, নিরক্ষরতা ও অশিক্ষার জন্য দায়ী।

হদিস:
১. ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার: দি ইন্ডিয়ান মুসলিমস, এম, আনিসুজ্জামান কর্তৃক তরযমাকৃত, খোশরোজ কিতাব মহল,
বাংলাবাজার ঢাকা-১১০০, পুনর্মুদ্রণ ২০০০
২. এম আর আখতার মুকুল: কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী, প্রথম মুদ্রণ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭, সাগর পাবলিশার্স ঢাকা
৩. মোহাম্মদ আবদুল মান্নান: বঙ্গভঙ্গ থেকে বাংলাদেশ, কথামেলা, বাংলাবাজার ঢাকা, ৭ম মুদ্রণ, এপ্রিল ২০০২
৪. সুরজিৎ দাশগুপ্ত: ভারতবর্ষ ও ইসলাম, সাহিত্য প্রকাশ, প্রথম বাংলাদেশ মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৪,
৮৭ পুরানা পল্টন লাইন, ঢাকা ১০০০
৫. আবুল মনসুর আহমেদ: আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, খোশরোজ কিতাব মহল, ১৫ বাংলাবাজার,
ঢাকা-১১০০, পুনর্মুদ্রণ সেপ্টেম্বর ২০১৩
৬. গোলাম আহমাদ মোর্তজা: চেপে রাখা ইতিহাস, বিশ্ববঙ্গীয় প্রকাশন, মদীনা মার্কেট, মেমারী, বর্ধমান,
পশ্চিম বাংলা, ভারত, ৮ম মুদ্রণ ২০০০,
৭. মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক: ভারতে মুসলমান ও স্বাধীনতা আন্দোলন, বাংলা একাডেমি ঢাকা, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ভাদ্র ১৪১০

Next Barisal banner ads

Leave a Reply

Your email address will not be published.