হিজল বনের পাখি কবি গোলাম মোহাম্মদ

আযাদ আলাউদ্দীন

‘হিজল বনে পালিয়ে গেছে পাখি/যতই তারে করুন কেঁদে ডাকি
দেয়না সাড়া নীরব গহীন বন/বাতাসে তার ব্যথার গুঞ্জরণ… ।
এমনি অনেক জনপ্রিয় গানের গীতিকার কবি গোলাম মোহাম্মদ। ২০০২ সালের ২২ আগস্ট ইন্তেকাল করেন বিশ্বাসী এই কবি। কবি গোলাম মোহাম্মদ ১৯৫৯ সালের ২৩ এপ্রিল মাগুরা জেলার মহম্মদপুর থানার গোপাল নগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
শহরের জীবন থেকে বহুদূরে সবুজ ক্ষেত আর আম কাঁঠাল-জাম ভরা এই গাঁয়ে বেড়ে ওঠেন তিনি। কবি গোলাম মোহাম্মদের পিতার নাম আবদুল মালেক মোল্লা। আর মাতার নাম করিমুন্নেসা। গোলাম মোহাম্মদের বাবা আবদুল মালেক মোল্লা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
মরহুম কবি গোলাম মোহাম্মদের ছিল অসাধারণ প্রতিভা। পাঠের প্রতি আগ্রহ, পাঠশালার প্রধান শিক্ষককে আকৃষ্ট করলো। ভালো ছাত্র হিসেবেও স্কুলে তার নাম পরিচিত হলো। সব ক্লাসের পরীক্ষায় তিনি প্রথম হতে লাগলেন। তাছাড়া তার চরিত্রের দৃঢ়তা, সত্যবাদিতা, বিনয়, সরলতা সবকিছু স্কুলের ছাত্র-শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। তিনি যে স্কুরে পড়তেন সেই স্কুলের নাম গোপালনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়, এই বিদ্যালয় থেকেই কবি প্রাথমিক বৃত্তিলাভ করেন। ১৯৭৫ সালে এমকেএইচ ইনস্টিটিউট থেকে গোলাম মোহাম্মদ বিজ্ঞান বিভাগে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাস করেন। তারপর কবি ঝিনাইদহ ফেন্সি কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে আইএসসি পাস করেন তিনি। তারপর চলে আসেন মাগুরা শহরে। ভর্তি হলেন মাগুরা কলেজে। এ কলেজ থেকে তিনি বিএসসি পাস করেন।
কবি গোলাম মোহাম্মদ যেমনি ছিলেন ভালো ছাত্র তেমনি গান ও ফুল-পাখিদের প্রতি ছিল তার প্রাণের টান। তিনি ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়াতেন। পাখি আর প্রজাপতিদের সাথে কথা বলতেন। টুনটুনিদের ঘুম ভাঙ্গাতেন। তার ডাকে সাড়া দিতো কামিনি, গোলাপ, জবা আর নাম না জানা কতো ফুল। ফুলে ফুলে ভরে যেতো তার ভোর। তার মনও ছিল ফুলের মতো সুন্দর। যেন সারাক্ষণ গন্ধ বিলিয়ে বেড়াতেন। তার গ্রামের দিনগুলো ছিল অত্যন্ত মধুর। পড়াশোনা, গান, ফুল, মাঠের শোভা এসব নিয়েই কাটে তার গ্রামে থাকার দিনগুলো।
এক সময় কবি চলে আসেন ঢাকায়। সব বন্ধুরাই শিল্প-সংস্কৃতির সাথে জড়িত। লেখালেখি, গান, কবিতা লেখা এসব তাদের কাজ। কবির জন্য ভালই হলো। তার লেখার গতিও বেড়ে গেলো। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হতে লাগলো নতুন নতুন কবিতা। প্রতিটি কবিতাই যেন রঙ্গরসে ভরা টইটুম্বুর। ঢাকায় এসে কবি প্রথমে একটি বড় প্রতিষ্ঠানের প্রকাশনায় সেবামূলক কাজ করলেন। তারপর ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ এডুকেশন সোসাইটিতে চাকরি নেন। কিন্তু এই চাকরি তার বেশিদিন ভালো লাগেনি। যার মন উড়ু উড়ু, তার কি এক জায়গায় স্থির থাকতে ভাল লাগে? তাছাড়া এই নিরহঙ্কার কবির কোন লোভ-লালসাও ছিল না। ফলে বড় কোন চাকরি যা অনেক টাকা পয়সা রোজগারের চিন্তা তিনি কখনো করেননি। তিনি চেয়েছিলেন সরল সহজভাবে জীবনযাপন করতে। অবশেষে ১৯৮৯ সালে ‘শিল্পকোণ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

প্রতিদিন নিয়মিত শিল্পকোণে বসতেন কবি গোলাম মোহাম্মদ। এই শিল্পকোণই এক সময় সব কবির মিলন কেন্দ্রে পরিণত হলো। যে কবির মধ্যে অহঙ্কারের লেশমাত্র ছিলনা, তার ভালোবাসার মধ্যেও তো কোন তারতম্য হতে পারে না। ঈমানদার এই উদার কবি ছিলেন সবার প্রিয় মানুষ, সবার প্রিয় বন্ধু।
কবি এক সময় সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সাহিত্য পাতায়ও কাজ করতেন। তাছাড়া বাংলা সাহিত্য পরিষদ ছিল তার আত্মার আত্মীয়। তিনি বাংলা সাহিত্য পরিষদের সাহিত্য সভা পরিচালনা করতেন।
শিল্পকোণের যে আয় হতো এ দিয়ে তার সংসার ভালই চলছিল। কারণ তারতো আর বেশি চাওয়া-পাওয়া নেই। যা রোজগার করতেন তা দিয়ে মাসের হিসাব চুকিয়ে নিতেন। এতে একটু কষ্ট হলেও তা সহজ করে নিতেন।
এক সময় কবি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তখন ঠিকভাবে নিজের ব্যবসার দিকে নজর দিতে পারতেন না। ফলে দিন দিন ব্যবসা কমে গেলো। অনেকেই তখন তার প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে চাইতেন না। ফলে শিল্পকোণ তাঁর আয়ের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ালো শূন্যের কোটায়। কিন্তু যে কবি মাথা উঁচু করে এসেছেন সে কবি তার মাথা উঁচুই রেখেছেন। কারো কাছে মাথানত করেননি কখনো। টাকার জন্যে নিজের বিবেককে বিক্রি করেননি। কোন বন্ধুকেও বিরক্ত করেননি। হয়তো তার অনেক বন্ধু তার অবস্থা জানতো, জেনেও না জানার ভান করে থাকতেন।
অবশেষে কবি খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। একদিকে দারিদ্র্যতা অন্যদিকে অসুস্থতা কবিকে তিলে তিলে শেষ করে দিল। কবির কোন কোন বন্ধু মুখ খুললেন। দু-একজনের সাথে আলোচনাও করলেন কবির চিকিৎসার জন্য। কিন্তু যারা ইচ্ছা করলে কবির জন্য অনেক কিছু করতে পারতেন তারা মুখ খুললেন না। কবির চিকিৎসার জন্য এগিয়ে এলেন না কেউ। এক সময় ঢাকা সাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক সাইফুল্লাহ মানছুর কবির সব বিষয় জানার চেষ্টা করলেন। নিজের হক আদায়ের জন্যে পাগলপারা হয়ে গেলেন, নিজের প্রতিষ্ঠান স্পন্দনে কবিকে চাকরি দিলেন। সেই সময়টি হলো ২০০২ সালের মার্চ মাস। স্পন্দনে কবির সাথে তাঁর গানের সুর দিতেন শিল্পী মশিউর রহমান, ছয় মাস দু-প্রতিভার কর্মচাঞ্চল্যতায় ভরে ওঠে স্পন্দনের সেই স্টুডিও। এতো গান লিখেছেন তিনি স্পন্দনে বসে যা ইতিহাস হয়ে থাকবে। গোলাম মোহাম্মদকে নিয়ে যতো লেখা হবে তার সাথে যোগ হবে স্পন্দনের কথা আর সাথে জড়িয়ে থাকবেন শিল্পী মশিউর রহমান।

কবি গোলাম মোহাম্মদের জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে:
রোজ বিহানে একটা পাখি…
সেই সংগ্রামী মানুষের সারিতে…
হলদে ডানার সেই পাখিটা…
হলুদ পাখি এই হাতে আয় আয়…
ফুল কেন ফোটে, পাখি কেন গায়…
মাঝিরে তোর মন ভাঙিস না…
চালতা পাতার কাজ দেখে আমি বুঝেছি… প্রভৃতি

কবি গোলাম মোহম্মদের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো হচ্ছে:
অদৃশ্যের চিল (১৯৯৭),
ফিরে চলা এক নদী (১৯৯৮),
হিজল বনের পাখি (১৯৯৯),
ঘাসফুল বেদনা (২০০০),
হে সুদূর হে নৈকট্য (২০০২)
শিশুদের জন্য রয়েছে তার ২টি ছড়াগ্রন্থ
‘ছড়ায় ছড়ায় সুরের মিনার’ ও
‘নানুর বাড়ী’। ##

আযাদ আলাউদ্দীন
পরিচালক
বরিশাল সংস্কৃতিকেন্দ্র

Next Barisal banner ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *