জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বরিশাল অধ্যায়

আযাদ আলাউদ্দীন।।
‘ধান-নদী-খাল এই তিন-এ বরিশাল’। বঙ্গোপসাগরের পলি বিধৌত বরিশালে একদিন কংক্রিটের রাস্তার চেয়ে জলপথ ছিল বেশি। প্রকৃতির অবাধ সৌন্দর্যের এই লীলাভুমিতে নিছক সৌন্দর্যের খোঁজে নয় বরং রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতা বিষয়ে বরিশাল এসেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। হক সাহেবের ভাগ্নে ইউসুফ আলীর আমন্ত্রণে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সাথে ১৯২০ সালের অক্টোবর মাসে বরিশাল আসেন তিনি।
এরপর ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ তথা ১৩৩৭ বঙ্গাব্দে বরিশালের স্মৃতি নিয়ে রচিত কবির দ্বিতীয় উপন্যাস ’মৃত্যুক্ষুধা’ গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয়। এর আগে মাসিক ‘সওগাত’ পত্রিকায় ১৩৩৪ এর অগ্রহায়ণ সংখ্যা থেকে ১৩৩৬ এর ফাল্গুন সংখ্যা পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে এ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল।

১৯২৬ সালের ২ জানুয়ারি কবি হুগলী ছেড়ে মাটির পুতুলের দেশ কৃষ্ণনগরে যান। সেখানে শ্রমজীবী খ্রীস্টান ও মুসলমান অধ্যুষিত চাঁদ- সড়ক এলাকায় একজন খ্রীস্টান নারীর বাড়িতে ওঠেন নজরুল। হতদরিদ্র এই পরিবারগুলোর ভাগ্য-বিড়ম্বিত জীবনের করুণ কাহিনীকে বাস্তব অভিজ্ঞতার রসে সিঞ্চিত করে কবি রচনা করেন ’মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসটি। এ উপন্যাসে বরিশাল একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে।
ক্ষুধার সর্বগ্রাসী প্রভাব কীভাবে মানুষকে ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, এমন কি তার আজন্ম লালিত ধর্ম-বিশাস ও মন-মানসিকতাকে পর্যন্ত বিপর্যস্ত করে ফেলে তারই বাস্তবচিত্র তিনি এঁকেছেন ’মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসটিতে। নিজের পারিবারিক জীবনের দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতাকে সাথে করে চাঁদ-সড়কের এই হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর দরিদ্রতার-স্বরূপ তিনি হৃদয়ের সবটুকু দরদ ও সহানুভূতি দিয়ে এঁকেছেন।

কাজী নজরুল ইসলাম মাত্র দু’দিন বরিশালে অবস্থান করেছিলেন। এ দু’দিনে বরিশালের যে বিশেষ দু’টি বৈশিষ্ট্য তাঁর মনকে নাড়া দিয়েছিল এর একটি হলো- খালে ঘেরা বরিশাল, যা ইতালীর ভেনিস শহরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। অন্যটি হল, বরিশাল খ্রীস্টান মিশনারীদের তৎপরতার ঘাটি।
’মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসের ২৩তম পরিচ্ছদে খ্রীস্টান মিশনারী অধ্যুষিত ও ঝাউবীথি সমৃদ্ধ যে এলাকা ও সড়কের বর্ণনা পাই, তা বরিশাল উদয়ন স্কুলের ভিতরে অবস্থিত রোমান ক্যাথলিক চার্চ এবং বান্দ রোড হিসেবেই অনুমান করা হয়।
‘মৃত্যুক্ষুধা’য় বরিশালের রুপের বর্ণনা এরকমের: ‘বরিশাল, বাংলার ভেনিস। আঁকাবাঁকা লাল রাস্তা শহরটিকে জড়িয়ে আছে ভুজবন্ধের মত করে। রাস্তার দু’ধারে ঝাউগাছের সারি। তারই পাশে নদী। টলমল করছে বোম্বাই-শাড়ি পরা ভরা যৌবন বধূর পথ চলার মত। যত না চলে, অঙ্গ দোলে তার চেয়ে অনেক বেশি। নদীর ওপারে ধান ক্ষেত। তারও ওপারে নারকেল সুপারীর কুঞ্জ ঘেরা সবুজ গ্রাম, শান্ত নিশ্চুপ। সবুজ শাড়ি পরা- বাসর ঘরের ভয় পাওয়া ছোট্ট কনে বৌটির মত। এক আকাশ হতে আরেক আকাশে কার অনুনয় সঞ্চরণ করে ফিরছে, ‘বৌ-কথা কও, বৌ-কথা কও।’
কবি নজরুল ইসলাম বরিশালে দু’দিন অবস্থানকালে ৪টি গান লিখেছিলেন। ছায়ানট ও সিন্ধুহিল্লোল কাব্যের এ গানগুলো হলো-
(১) বন্ধু আমার থেকে থেকে/ কোন সুদূরের নিজন পুরে/ ডাক দিয়ে যাও ব্যথার সুরে,
(২) হয়তো তোমার পাব দেখা/ যেখানে ঐ নত আকাশ চুমছে বনের সবুজ রেখা,
(৩) কোন মরমীর মরম ব্যথা আমার বুকে বেদন হানে/জানি গো সেও জানেই জানে,
(৪) পথিক ওগো চলতে পথে/ তোমায় আমায় পথের দেখা।
এ গানগুলো স্বরলিপিসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া নজরুলের গীতিশতদল-এর ‘পল্লী নৃত্যে’র অংশে বরিশাল প্রসঙ্গ এসেছে এভাবে-‘ও গিজে যাসনে ভিজে/ ও গিজে ঠান দিদি যে/ সাবাস বেটি বকন ছা/কলা মোচায় ফড়িং খা / ও গিজে তাল ভটাভট!/ও গিজে যাচ্চলে যা বরিশাল্যা, পাবনা, ঢাকা, খুলনা জেলা।

কাজী নজরুল ইসলামের সাথে বরিশালের কৃতিসন্তান শের-ই-বাংলা এ, কে ফজলুল হকের ছিল অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক। ফজলুল হকের ‘নবযুগ’ পত্রিকা দিয়েই নজরুলের সাংবাদিকতা জীবন শুরু। নজরুল সাহিত্য, জীবন ও প্রতিভা লালনে শের-ই-বাংলার অবদান অনস্বীকার্য। গণমুখীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা, স্বাধীন অবিভক্ত বাংলার প্রবক্তা হিসাবে এ দু’জনের মধ্যে ছিল মনমানসিকতাগত সাদৃশ্য ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা। যদিও মাঝে মধ্যে মতের অমিল হয়েছে, কিন্তু বিচ্ছেদ ঘটেনি। নবযুগ পত্রিকা ছাড়াও সিলেট সফর, কলকাতায় জাতীয় সংবর্ধনা, অসুস্থ নজরুলের চিকিৎসায় শের-ই-বাংলা সবসময় ছিলেন নজরুলের পাশে। কবির দৃষ্টিতে ফজলুল হক ছিলেন ‘জগলুল পাশা।’
নজরুল-ফজলুল হক সম্পর্কের বিষয়ে প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমদ লিখেছেন: ‘ফজলুল হক সাহেব কাজিদাকে খুব ভালবাসতেন। ওয়াছেল মোল্লার দোকানের দোতালায় একবার ঈদ-রিইউনিয়নে কাজীদা আর আমাকে দাওয়াত করা হয়েছিল। সেখানে ফজলুল হক সাহেব উপস্থিত। তিনি বললেন, কাজি, একটা ঈদের গান গাও দেখি। কাজিদা আর আমি দু’জনে মিলে গাইলাম ‘ঈদ মোবারক’।

বৃহত্তর বরিশালের ভোলা জেলায় জন্মগ্রহণকারী কবি এবং ‘জাতীয় মঙ্গল’ কাব্যের প্রণেতা কবি মোজাম্মেল হক ছিলেন ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। এ সমিতি থেকে ত্রি-মাসিক ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা’ প্রকাশিত হতো। এ পত্রিকায় ‘কোরক’ শিরোনামে নতুন কবিদের কবিতা পেতো। এখানেই ১৩২৬ এর শ্রাবণ-সংখ্যায় (১৯১৯-জুলাই-আগস্ট) কবি নজরুলের প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ প্রকাশিত হয়। প্রথমে কবিতাটির শিরোনাম ছিল ‘ক্ষমা’। কবি মোজাম্মেল হকের পরামর্শে পরে কবিতার নামকরণ হয় ‘মুক্তি’। এছাড়া কবি মোজাম্মেল হকের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ‘ওরিয়েন্টাল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স লিমিটেড’ হতে নজরুলের ‘পুবের হাওয়া’ গ্রন্থটি প্রকাশ পায়।
বরিশালের অন্যতম কৃতি-সন্তান-অশ্বিনী কুমার দত্তের প্রতি ছিল কবি নজরুলের অগাধ শ্রদ্ধা। বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলনের যুগে বরিশালের অবিসংবাদিত নেতা, ১৯০৮ সালে আলিপুর বোমা হামলার অন্যতম আসামী অশ্বিনীকুমার দত্তের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে কবি ‘অশ্বিনীকুমার’ কবিতাটি লিখেছেন। বাঙালি যেন আবার আত্মচেতনা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মশ্রদ্ধার জোরে জীবন উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতে পারে। মরা জাতি যেন বাঁচে সে জন্যে এ মহাপুরুষের কাছে আশির্বাদ প্রার্থনা করে কবিতাটির শেষে লেখা হয়-
‘হে প্রেমিক তব প্রেম বরিষায় দেশে
এল ঢল বীরভূমি বরিশাল ভেসে
সেই ঢল সেই জল বিষম তৃষ্ণায়-
যাচিছে উষর বঙ্গ তব কাছে হায়।’

আরো পড়ুন

‘মুক্তবুলি’র মোড়ক উন্মোচন করলেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক

আযাদ আলাউদ্দীন।। বরিশাল থেকে নিয়মিত প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা মুক্তবুলি ৩৯তম সংখ্যার (নভেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৫) মোড়ক উন্মোচন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *