৭৫ বছরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

ফজলুল কাদের মজনু মোল্লা ।।

এক
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক প্রস্তুতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ব্যতিত অন্য কোন নেতার চিন্তা ভাবনা ছিল এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ১৯৪৭ এর রেড ক্লিপ রোয়েদাদ এর ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার সীমানা নির্ধারণ এবং পরবর্তী ১৯৪৭ এর দেশ ভাগের পর বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক নেতা মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদীকে তৎকালীন মুসলীমলীগ সরকার পূর্ব বাংলায় আসতে বাধা প্রদান করার থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তান এর অস্থিত্ব ও পূর্ব বাংলা জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়েন। আরো আগে ভারত বিভক্তির মাধ্যমে পূর্ব বাংলাকে আলাদা ডমিনিয়ন এর মর্যাদা না দেওয়া, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও শরৎ বোশ এর যুক্ত বাংলার পরিকল্পনা কংগ্রেস, মুসলীমলীগ এর ষড়যন্ত্রের ফলে ভেস্তে যাওয়ায় বঙ্গবন্ধু মনে রেখাপাত করেছিল।
১৯৪৭ এ ভারত থেকে পূর্ব বঙ্গে ফিরে এসে তৎকালীন মুসলীমলীগ এর প্রগতিশীল যুবকর্মী বাহিনীর সাথে বঙ্গবন্ধুর ছিল নিবির সম্পর্ক। এই কর্মীদের নিয়ে প্রথম ১৯৪৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস চেয়ারম্যান খান বাহাদুর আবুল হাসনাত এর বেচারাম দেউরির বাসভবনে পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে দুই একটি সভা করার পর তার কার্য্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপরে একটি কার্য্যকর মুসলিমলীগ বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার লক্ষে প্রাক প্রস্তুতি স্বরূপ ১৯৪৮ সনের ৪ঠা জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হলের এক ছাত্র সভায় বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ।

১৯৪৮ সনের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান এর রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানান। ১৯৪৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ভোলার কৃতি সন্তান সামসুল আলমকে আহবায়ক করে রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ গঠন করা হয়। রাষ্ট্রভাষায় প্রশ্নে সচিবালয়ের সামনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্রজনতার মিছিলে পুলিশ এর বাধা ও সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সহ ৬৯ জন ছাত্র গ্রেফতার হন।

পূর্ব বাংলার মূর্খমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নার পূর্ব বাংলায় আগমন নিস্কণ্ঠক করার জন্য ছাত্র নেতৃবৃন্দের সাথে এক আপোষ চুক্তি করেন। ১৯৪৮ সনের ১৬ই মার্চ শেখ মুজিব এর নেতৃত্বে ও সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় এক ছাত্র সভা অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিব তার বক্তব্যে বলেন খাজা নাজিমুদ্দিনকে চিনি, তিনি চুক্তির মর্যাদা রাখবেন না। অবশেষে ১৯ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে গভর্ণর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার বক্তব্যে বললেন ‘উদূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’।

অতঃপর সেই থেকে শুরু বাংলার রাজনীতির নূতন দিক পরিবর্তনের। ১৯৪৯ সালে শেখমুজিব জেলে অন্তরীণ। শেখ মুজিব জেলের বাহিরে থাকতেই মুসলীমলীগ এর তরুণ কর্মীদেরকে নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন একটি কর্মী সম্মেলন করার জন্য। যথারীতি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে কর্মী সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় একটি অভ্যর্থনা কমিটি করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সনের ২৩ জুন সকাল ১০টায় কে এম দাস লেনের বশির সাহেবের রোজ গার্ডেনের বাসভবনে কর্মী সম্মেলন শুরু হয়। সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে একটি নূতন দল গঠিত হয়। সভাপতি করা হয় মাওলানা ভাষানীকে, সাধারণ সম্পাদক হন টাংগাইলের সামসুল হক। জেলে থেকেই যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। সেই থেকে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় মুসলীমলীগ বিরোধী প্রথম বিরোধী দলের যাত্রাশুরু। জেল থেকে বের হয়েই সারা বাংলায় সংগঠন এর কাজে ঝাপিয়ে পড়েন শেখ মুজিব। কিছুদিনের মধ্যে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে নিয়ামক শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হলো আওয়ামী মুসলীম লীগ।

১৯৪৯ সালের ১৫ই আগস্ট আওয়ামীলীগের নিজস্ব পত্রিকা হিসাবে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক প্রকাশিত হলো। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে পাকিস্তানের মুসলীমলীগ দলীয় শাসক গোষ্ঠী উর্দূকে রাষ্ট্র ভাষা ঘোষণার পর ১৯৫১ সনে ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠিত হয়। ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল বিক্ষোভ ও সমাবেশের কর্মসূচি প্রদান করা হয়। শেখ মুজিবকে বন্দি অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। ৮ই ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব আন্দোলনের প্রশ্নে আপোষ এর বিরুদ্ধে ছিলেন। শেখ মুজিব যেকোন মূল্যে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ার পরামর্শ দেন। ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্র জনতা মিছিলে নামে। মিছিলে পুলিশ এর গুলিতে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, প্রমুখ। মুহূর্তে রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যায়। ১৯৫২ সালে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভা ভেঙ্গে দেয়া হয়। আন্দোলনের মুখে ১৯৫৪ সালে নির্বাচন ঘোষণা করা হলো। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলো। আওয়ামী মুসলীম লীগ প্রণীত ২১ দফাই যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইসতেহারে পরিণত হয়। বিজয়ী নেতা শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী ও মওলানা ভাসানী, সংগঠক শেখ মুজিব। নির্বাচনের ফলাফল সর্বমোট ৩০৯টি আসনের সাধারণ আসনের ২৩৭টি মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসনে জয়লাভ করে। মুসলিমলীগ মাত্র ৯টি স্বতন্ত্র ৫টি।

পূর্ববাংলার শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। শেরে বাংলা কলকাতা সফরে গিয়ে পাকিস্তানের সার্ভভৌমত্বের উপর আঘাত করে বক্তব্য দিয়েছেন বলে কেন্দ্রেীয় সরকার অভিযোগ করেন। ইতিমধ্যে শেখ মুজিবসহ অনেককেই পূর্ববঙ্গ মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়। মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই নারায়নগঞ্জের আদমজী জুট মিলের বাঙ্গালি বিহারী দাঙ্গা বাধানো হয়।

শেরে বাংলার কোলকাতার বক্তব্যকে অজুহাত ও বাঙ্গালী বিহারী দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে শপথ নেয়ার ১৫ দিনের মাথায় ৯২ ক ধারা মতে প্রাদেশিক সরকার ভেঙ্গে দিয়ে গভর্নর এর শাসন জারী করে কেন্দ্রীয় সরকার। শেরেবাংলাকে কে এম দাস লেনের বাড়িতে নজরবন্দী করা হয়। যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় গিয়েই ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করেছিল। গভর্নর ইস্কান্দায় মীর্জা তাও বাতিল করে দেন।

১৯৫৪ সনে ৩১ মে প্রথমে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। ১৯৫৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক জননিরাপত্তা আইনে নিষিদ্ধ করা হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৪ সালের ১২ নভেম্বর জুরিখ চলে যান চিকিৎসার জন্য। ১৯৫৪ সালের ১৩ নভেম্বর শেখ মুজিবুর রহমানের জামিন হলেও অন্য মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। একই সনের ১৮ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রচেষ্টায় শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে মুক্ত হন। ১৯৫৫ সনের ২১ সেপ্টেম্বর সদরঘাট এর রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামীলীগের কাউন্সিল অধিবেশন বসে। আওয়ামীলীগ সাধারণ নির্বাচনের দাবি তুলে। অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দলকে গড়ে তোলার মানশে হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী প্রস্তাব তোলেন। কাউন্সিলে উপস্থিত সকলে এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন। এই অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা ভাসনী। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান গণ-পরিষদে সংবিধান গৃহিত হয়। পরিষদে সেদিন সংবিধানের উপর আলোচনা করতে গিয়ে শেখ মুজিব বলেছিলেন ‘পূর্ববঙ্গের নাম পূর্বপাকিস্তান রাখার অধিকার এই পরিষদের নেই এবং সংবিধানে তা বৈধ নয়।
১৯৫৬ সালের ২৩ জুলাই পল্টন ময়দানে শেখ মুজিব পূর্বপাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন দাবি করেন। ইতিপূর্বে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৬ সালের ৩১ মে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করে দলের সাধারণ সম্পাদকের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৫৭ সালের ১৩ জুন শাবিস্থান হলে আওয়ামীলীগের কাউন্সিল অধিবেশন হয়। ওয়ার্কিং কমিটি নূতন করে গঠন করা হয়। মওলানা ভাসানী পদত্যাগ করলেও তাকেই সভাপতি করা হয়। সাধারণ সম্পাদক হিসাবে শেখ মুজিব পুনঃ নির্বাচিত হন। মওলানা ভাসানী পদত্যাগে অনড় থাকাতে শেখ মুজিবুর রহমানকেই দলের পরিপূর্ণ হাল ধরতে হলো। মাওলানা তর্ক বাগিশকে সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯৫৮ সনের ১ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ আতাউর রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করা হলো। হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী শেখ মুজিবকে কয়েকটি দেশে সফরে পাঠালেন এবং বললেন ভবিষ্যতে নেতৃত্ব তাকেই দিতে হবে। সে কথাই পরবর্তীকালে সত্যে পরিণত হলো।

দুই
১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর জেনারেল আইউব খান পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা দখল করে বসেন। ১৯৫৮ সালের ১২ অক্টোবর শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হলেন। মুক্তি পেলেন ১৯৫৯ সনের ১৭ ডিসেম্বর। ১৯৬২ সনের ৩০ জানুয়ারি হঠাৎ করেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী গ্রেফতার হলেন। গ্রেফতারের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে বিক্ষোভ প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
আইউব খানের অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে ৯ জন বিরোধী দলের নেতা ৬২ সালের ২৪ জুন এক যুক্ত বিবৃতি দান করেন। এই ৯ নেতার মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান অন্যতম।
১৯৬২ সালের ১৯ আগস্ট হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদীকে মুক্তি প্রদান করা হয়। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর ভৈরুবের একটি হোটেলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী ইন্তেকালে করেন। তার মৃত্যুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ভেঙ্গে পড়েন। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বর বাড়িতে এক বিশেষ সম্মেলন ডাকেন।

তিন
সম্মেলনে জেলা মহকুমা শাখার সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক সহ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ১৯৬৪ সালের ১লা মার্চ সভার সিদ্বান্ত অনুসারে আওয়ামী লীগ ঘোষণা দিয়ে দলের পুনরউদ্ধার ঘটায়। এরই ধারাবাহিকতায় একের পর এক কর্মসূচি নিয়ে আওয়ামী লীগ জেলা, থানা, গ্রাম পর্যায়, সংঘঠিত হতে থাকে। জেনারেল আইউবের স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেয় আওয়ামী লীগ।
১৯৬৫ সালে মৌলিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থী হিসাবে ফাতেমা জিন্নাকে প্রার্থী করা হয়। নির্বাচনে শেখ মুজিব সারাদেশে সফর করে দলকে সংগঠিত করায় সাথে সাথে জনগনকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হন। মৌলিক গনতন্ত্রের ভিত্তিতে নির্বাচনে ফাতেমা জিন্না হেরে গেলেও দেশে আইউব বিরোধী একটা আবহ তৈরি হয়। ১৯৬৫ সনের পাক-ভারত যুদ্ধের পর শেখ মুজিবের উপর একের পর এক জেল নির্যাতন চলতে থাকে। ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নেজামে ইসলাম পার্টির প্রধান লাহোরের চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে পাকিস্তানের সকল বিরোধী দলের সভা বসে। বিরোধী দলের এই বৈঠকে শেখ মুজিব ঐতিহাসিক ৬দফা দাবি উপস্থাপন করেন। বৈঠকে অনান্য বিরোধী দল স্বায়ত্বশাসন কথা না তোলার জন্য আহব্বান জানান। তিনি লাহোরে সাংবাদিক সম্মেলন করে ৬দফা ঘোষণা করেন। ১৯৬৬ সালের ৭মার্চ পাকিস্তানের সকল পত্রপত্রিকায় ৬ দফার খবর ছাফা হয়। ১১ মার্চ ঢাকায় ফিরে এসে বিমানবন্দরে সাংবাদিক সম্মেলনে ৬ দফার ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি ৬ দফাকে বাঙালির বাচার দাবি বলে উল্লেখ্য করেন।

১৯৬৬ সালের ১২ মার্চ আইউব খান ঢাকায় এসে এক বক্তব্যে স্পষ্ট করে বললেন, আওয়ামী লীগের ৬ দফা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের হুমকি স্বরূপ। ১৯৬৬ সালের ১৩ মার্চ আওয়ামী লীগ এর ওয়ার্কিং কমিটি ও ৬ দফা অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়। দলের সভাপতি মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ কাউন্সিল বিরোধিতা করে বৈঠক ত্যাগ করেন। পরে সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে কাউন্সিল অধিবেশন অনুমোদন নেয়ায় মাধ্যমে ওয়ার্কিং কমিটি ৬ দফা অনুমোদন করে। ১৯৬৩ সালের ১৮ মার্চ মতিঝিলের হোটেল ইডেনে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ৬ দফা বিপুল সমর্থনে অনুমোদন দেয়া হয়। ১৯ মার্চ দলের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে দলের সভাপতি ও তাজউদ্দিন আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এই সম্মেলনের মধ্যে দিয়েই বঙ্গবন্ধু দলে তার লড়াকু টিম তৈরি করে ফেলতে সক্ষম হন। ১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ ৬ দফার পক্ষে ঢাকার পল্টন ময়দানে প্রথম জনসভাটি অনুষ্ঠিত হয়। ধীরে ধীরে ৬ দফা ভিত্তিক গণআন্দোলন রূপ নেয় সারা পূর্বপাকিস্তানে। বঙ্গবন্ধু সারা পূর্ববাংলা সফরে বিভিন্ন পর্যায় জেল জুলুমকে উপেক্ষা করে জনসভা করে। ৬ দফা বাংলার ঘরে ঘরে পৌছে দেন। বঙ্গবন্ধু প্রতিটি জনসভায় বলতেন। ওরা বেশি সময় দিবে না। পাশাপাশি ৬ দফা প্রচারে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিলো সবচেয়ে বেশি। ২০ মার্চের পর শেখ মুজিব সময় পেয়েছিলেন মাত্র পাচঁ সপ্তাহ। ৩৫ দিনে তিনি ৩২ টি মুল জনসভায় বক্তব্য রাখেন। বিভিন্ন জেলা মহকুমা সফরের শেষ পর্যায় ১৯৬৬ সালের ৭ মে ওয়ার্কিং কমিটির সভায় তিনিও ৬ দফা আন্দোলনের কর্মসূচি নতুন করে তৈরি করেছেন। ৮ মে তিনি নারায়নগঞ্জে বিশাল জনসভা করলেন। মুলত এটাই ছিল ৬ দফা দাবিতে তার শেষ জনসভা। তিনি জানতেন, এ পরে আর সময় পাবেন না। ঐ দিনই গভীর রাতে ৩২ নং বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে সরাসরি জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে দেশ রক্ষা আইনে বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ তোলা হয়। আওয়ামী লীগ এর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করা হয়। বঙ্গবন্ধু এমনভাবে সংগঠনকে ঢেলে সাজিয়েছেন যে, যাতে করে তৃণমূলের নেতারাই আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে নিতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফাকে আওয়ামী লীগ ছাড়া কোন রাজনৈতিক দলই সমর্থন করেনি। প্রত্যেকেই এর বিরোধীতা করেছে। এমনকি বঙ্গবন্ধুর নিজ দলের অনেক নেতাও দল থেকে বের হয়ে গিয়ে বিরোধীতা করেছিলেন। তারপরও ৬ দফার যে ঢেউ বঙ্গবন্ধু তৈরি করেছিলেন তা গ্রাম পর্যন্ত আছরে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু জেলে, সিনিয়র নেতৃবৃন্দ জেলে, তাদেরকে রেখে ১৩ মে পল্টনে জনসভা হয় আওয়ামী লীগের ডাকে, উপস্থিত জনতার উপস্থিতিতে প্রমাণ হয় ৬ দফার কোন বিকল্প নেই। ঐ জনসভাতেই ৭ জুন সারাদেশে হরতালের ডাক দেয়া হয়। ৭ জুনের হরতালে তেজগাওয়ের শ্রমিক মুনুমিয়া পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এতে বিক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পরে সারাদেশে, ওইদিনই নারায়নগঞ্জে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ৬ জন শ্রমিক। ঢাকা নারায়নগঞ্জ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সরকার সন্ধ্যায় ঢাকা, নারায়নগঞ্জ কার্পূ জারী করেন গ্রেফতার করেন অসংখ্য নেতাকর্মীকে।

১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের তৃতীয় সারির ১৬ জন নেতা গ্রেফতার হয়ে যান। ১৫ তারিখ ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করা হয় । মওলানা ভাসানীসহ পিভিন পন্থী নেতৃবৃন্দ ৬ দফাকে সি, আইএর উক্সান বলে বিবৃতি প্রদান করা সত্তেও আন্দোলন দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে। গভর্নর মোনায়েম খান শত চেষ্টা করেও ৬ দফা আন্দোলন স্থিমিত করতে সক্ষম হতে পারলেন না।

১৯৬৭ সালের ৩ জুন মোনায়েম খা ঢাকায় এক সম্মেলন ইংগিত করলেন যে কিছু সরকারি আমলা ও সেনাবাহিনীর সদস্য এই ৬ দফার সাথে জড়িত। তারা ধংসাত্মক পথে পা দিয়েছেন। বস্তুত তার এই বক্তব্য আগরতলা ষড়যন্ত মামলার ইংগিত স্বরূপ। ১৯৬৭ সালে কারাচিতে আইউবখান একই ইংগিত করলেন। ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি সরকারি প্রেসনোটে উল্লেখ করা হলো ভারতীয় হাই কমিশনের ফাস্ট সেক্রেটারি মিঃ ওঝার সঙ্গে যোগাযোগে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার যে ষড়যন্ত হয়েছিল সরকার তার বিরুদ্ধে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগ থেকে ১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদেরকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অন্তভূক্ত করা হলো। মামলার শিরোনাম হলো রাষ্ট্র (পাকিস্তান) বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ১৭ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে মুক্তির কথা জানিয়ে দিয়ে জেল গেইটে বের করে এনে গভীর রাতে পুনরায় গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়।

১৯৬৮ সনে আওয়ামী লীগের ডাকে শেখ মুজিবসহ সকল বন্দির মুক্তি দাবি করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পরে। শেখ মুজিবসহ আগরতলা মামলায় আসামীদের বিচার করার জন্য সেনানিবাসে বিশেষ আদালত গঠন করা হয়। ইতিমধ্যে ৬ দফা সংবলিত ১১ দফার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এর নেতৃত্বে ছাত্র জনতার আন্দোলন ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যূত্থানে পরিণত হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ৬ ফেব্রুয়ারি চুড়ান্ত ঘোষণা দেয়া হয়। আগরতলা মমলা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। ১৭ ফ্রেব্রুয়ারি সেনানিবাসে আগরতলা মমলার আসামীদের উপর সেনাবাহিনী গুলি চালায় সাজেন্ট জহুর গুলিতে নিহত হন। সাজেন্ট ফজলুল হক আহত হন। খবরটি ঢাকায় ছড়িয়ে পরলে প্রচন্ড গণবিস্ফোরন ঘটে। ঢাকাসহ সারাদেশ প্রজ্জালিত হয়ে উঠে, সারাদেশ থেকে মৃত্যুর খবর আসতে থাকে। আগারতলা ষড়যন্ত মামলার বিচারকের বাসায় ছাত্র জনতা হামলা চালায়, প্রদেশেএর ১০ জন মন্ত্রির বাসায় আগুন দেয়া হয়। ১৮ তারিখ কারফিউ বলবৎ করা হয়। ছাত্র জনতা কারফিউ ভেঙ্গে রাস্তায় নেমে আসে।

১৯৬৯ এর ২১ ফেব্রুয়ারি আইউব খান বেতার ভাষণে বলেন- তিনি আর প্রেসিডেন্ট পদে দাড়াবেন না। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করা হলো। ২২ ফেব্রুয়ারি বন্দি শেখ মুজিবসহ সকলকে মুক্তি দেয়া হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি মুক্ত মুজিবকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ রমনার ময়দানে গণ সংবর্ধনা প্রদান করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৬৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাওয়াল পিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠক বসে। গোলটেবিল বৈঠকে ৬ দফা আলোচ্য বিষয়। বঙ্গববন্ধুকে ৬ দফার একটি দফা প্রত্যাহারের জন্য বলা হয়। বঙ্গবন্ধু তা না করে দেন। ফলে আলোচনা ভেঙ্গে যায়। ২৫ মার্চ আইউব খানের পতন ঘটে। জেনারেল ইয়াহীয়া ক্ষমতা দখল করেন। ২৮ মার্চ ইয়াহিয়া পঃ পাকিস্তানের এক ইউনিট বাতিল করেন। ১৯৭১ এর ৫ অক্টোবর জাতীয় পরিষদ ২২ অক্টোরব প্রাদের্শিক পরিষদের নির্বাচন ঘোষণা করেন। ১ জানুয়ারি থেকে প্রকাশ্য রাজনীতির অনুমতি দেন।

১৯৭০ এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে নির্বাচনী প্রচার সভা শুরু করেন। ১৯৭০ এর ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকতে মাজার সংলগ্ন আলোচনা সভায় দাড়িয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে বললেন- আজ থেকে এই দেশের নাম পূর্বপাকিস্তান নয় পূর্ববাংলাও নয়। এই দেশের নাম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার লক্ষে পৌছার জন্য দেশের নামকরণও সম্পন্ন করলেন বঙ্গবন্ধু। জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু অংশগ্রহণ করা নিয়ে ইতিমধ্যেই ছাত্রলীগের মধ্যে বির্তক শুরু হয়। ইয়াহিয়ার এল.এফ ও অধিনে নির্বাচনে কি সুফল আসবে তা নিয়ে মতবেদ তৈরি হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনের অংশগ্রহণের বিষয় নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের এক বর্ধিত সভা ১৯৭০ এর জুন মাসে বলাকা বিলডিং ছাত্রলীগের কার্য্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

আমি সেই সভায় ভোলা মহুকমা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যোগদান করি। সভায় এক অংশ এল. এফ ও অধিনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাকে সঠিক হয়নি বলে বক্তব্য দেন। আর এক পক্ষ সঠিক হয়েছে বলে বক্তব্য প্রদান করেন। সর্বশেষ কোন সিদ্ধান্ত না হওয়াতে, সিদ্ধান্ত হয় বঙ্গবন্ধুকেই জিজ্ঞাস করা হউক কেন তিনি এল. এফ ও অধিনে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেন। একযোগে ছাত্রনেতারা বঙ্গবন্ধুর ৩২ নং ধানমন্ডির বাসায় মিছিল করে যান। বাসায় পৌছার পর বঙ্গবন্ধু তার দোতালা সিড়ি দিয়ে নেমে আসছিলেন আর গাইছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ কবি শুরুর এই গানটি। এক পর্যায় ছাত্রলীগের তৎকালীন প্রচার সম্পাদক শহীদ স্বপন কুমার চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলেন এই গান কেন গাইলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন তোমরাও আমার সাথে এই গান গাও। এটাই হলো স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। বঙ্গবন্ধুর এই একটি বাক্য সেদিন ছাত্রলীগের নেতাদের জিজ্ঞাসায় সকল সমাধান হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু বললেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি একটি অথরিটি অর্জন করার জন্য পাকিস্তানের ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়। জনগনের মেন্ডেট নেয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধুর সেদিনের সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে সঠিক হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসন এর মধ্যে আওয়ামীলীগ ১৬৭ টি আসন জয়লাভ করে ইতিহাস সৃষ্টি করে। প্রাদেশিক পরিষদের সর্বমোট ৩১০ টি আসন এর মধ্যে আওয়ামীলীগ ২৮৭ টি আসন লাভ করে।

নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির টনক নড়ে ওঠে। ২৬ জানুয়ারি ভূট্রো ঢাকায় আসলেন। ২৭ জানুয়ারি হোটেল ইন্টাকনে মুজিব ভূট্রো বৈঠকে বসলেন। ভূট্রো বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করলেন ৬ দফার ব্যাপারে ছাড় দেয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধু বললেন ছাড় দেয়ার প্রশ্নই আসেনা কারণ- জনগন ৬ দফার উপর মেন্ডেট দিয়েছে। একটি দফাও প্রত্যাহার করার অধিকার জনগন কাউকে দেয়নি। ১ মার্চ ইয়াহিয়া পূর্বঘোষিত ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করেন। এই ঘোষণার পর ঢাকা সহ সারাদেশ ছাত্র জনতা বিক্ষোভ ফেটে পড়ে। বঙ্গবন্ধু তৎক্ষণিক শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। অচল হয়ে পড়ে সারাদেশ। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের নির্দেশে পরিচালিত হয় সারা বাংলাদেশ। কার্য্যত তখন থেকেই বাংলাদেশের প্রকৃত শাসন ক্ষমতা বঙ্গবন্ধুর হাতে চলে আসে। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় চুড়ান্ত সংগ্রামের ঘোষণা দেন। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এই ভাষণের মধ্যে দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালির জাতিকে তৈরি করলেন। মহামুক্তির সংগ্রামে ১৯৭১ ২৫ মার্চ রাতে বর্বর পাক হানাদার বাহিনী ঝাপিয়ে পড়ে বাঙালি জাতির উপর, তাৎক্ষণিক বঙ্গবন্ধু ওয়ারলেস যোগেও টেলিগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতার অমোগ ঘোষণা পৌছে দিলেন। সাড়া বিশ্বে আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন, একটি পাক হানাদার বাহীনি জীবিত থাকতে ও প্রতিরোধ চালিয়ে হানাদার মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সমস্ত জাতিকে আহব্বান জানান। সেই থেকে ৯ মাসের প্রতিরোধ যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ মুক্ত স্বাধীন জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেলো।

স্বাধীনতা ঘোষণার পর ১০ এপ্রিল নির্বাচিত জন প্রতিনিধিগন এক সভায় মিলিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে সমর্থন ও অভিন্দন জানিয়ে গ্রহণ করেন আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। এই গণপরিষদেই বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অনুপুস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করে পরিষদ গঠন করা হয়। ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করে মুজিবনগর সরকার। ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন স্বদেশে ফিরে এলেন বাঙালি জাতির মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। যুদ্ধ বিধস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তোলার মানষে পূনগঠন কাজ সমাপ্ত করে বঙ্গবন্ধু যখন দৃঢ় পায়ে অগ্রগতির পথে জাতিকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিললেন ঠিক সেই মূহর্তে বাংলার স্বাধীনতার শত্রুরা বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন দেশের বাইরে অবস্থান করার কারণে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা থেকে যান। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর উচ্চাবিলাসী সামরিক চক্র বাংলার স্বাধীনতা ও স্বকিয়তাকে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে। ঠিক সেই এক কঠিন সময়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন এবং দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সেই থেকে আওয়ামী লীগের নতুন অভিযান শুরু। জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে দলের নেতাকর্মী বাহিনীর সকল ভয়ভীতি যেন এক নিমেষেই উড়ে গেল। জেগে উঠলো দলের নেতা কর্মীরা।

চার
জিয়ার পতন, এরশাদের স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলন, নব্বইয়ের গণআন্দোলন, এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে নূতন বিজয় সুচিত হলো। এই বিজয় হোচট খেলো বিএনপির চক্রান্তের কাছে। পরবর্তীতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দাবিতে ১৯৯৬ ফেব্রুয়ারি মার্চের গণ আন্দোলন, অসহযোগ, জনতার মঞ্চকে ঘিরে গণ অভ্যূত্থান এবং খালেদা জিয়ার পদত্যাগ জাতীয় ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
অবশেষে ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্ব বিজয় লাভ করে ঐকমত্যের সরকার গঠন করে। জননেত্রী শেখ হাসিনার ৫ বছর শাসনামলে এক সম্ভবনার দেশ হিসাবে বাংলাদেশ অর্জন করেছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। দেশের সামনে উম্মোচিত হলো অপার সম্ভাবনার এক স্বর্ণধুয়ার, অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে।
মাঝ পথে পুরানো ষড়যন্ত্র চক্রান্তের কারণে ২০০১ এ বিপত্তি ঘটে আওয়ামীলীগের। ২০০১ এর পর দেশ যখন দুর্বৃত্ত কবলিত হয় এবং বিএনপির জামায়াত জোটের ৫ বৎসরের দু:শাসনের ফলে জাতির সম্ভবনার অপমৃত্যু ঘটে। তখন আবার জাতির বোধোদয় হয়, পুনরায় দ্বিতীয় বারের মতো জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর একটি অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে মহাজোট সরকার তথা আওয়ামীলীগ বিজয় অর্জন করে।
দেশের সংবিধানের ধারাবাহিকতা ও অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে অবশেষ নির্বাচনের মাধ্যমে জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকার পরপর তিনবার ক্ষমতায় আসেন। দেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করা হয়েছে। এরমধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগ তার প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর পালন করছে। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

তথ্যসূত্র: মুক্তবুলি ম্যাগাজিন ৩০ এবং ৩১ তম সংখ্যা।

ফজলুল কাদের মজনু মোল্লা
সভাপতি, ভোলা জেলা আওয়ামী লীগ।
সাবেক সভাপতি, ভোলা প্রেসক্লাব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *