ছবুর মিয়ার স্বপ্ন

আরিফা সানজিদা

বর্ষা মৌসুমে মেঠোপথ ফুসলে ওঠে বৃষ্টির পানিতে, পা গেড়ে যায় হাঁটুপর্যন্ত। টিনের দোচালা ঘরে জং ধরা টিনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র, হালকা বাতাসে নড়ে উঠে খুঁটি। নিভুনিভু হ্যারিকেনের আলোয় ভেজা বই শুকানোর চেষ্টা করছে সালমা, একটিমাত্র ছাতা ছোটভাইয়ের বায়না ওর সেটা চাই নইলে স্কুল কামাই দিয়ে মাঠে গাঁয়ের ছেলেপুলেদের সাথে কাদা ছুড়াছুঁড়ি খেলবে, নির্ঘাত কাকভেজা হয়েই বাড়ি ফিরতে হয় রোজ। ও পাড়ায় নাকি বিদ্যুৎ এসেছে, রাস্তায় ইট বিছিয়েছে। আর ওদের কি হাল!  অভাবের সংসার, দুবেলা দুমুঠো ভাত জোগাড় করতেই দায়সারা ছবুর মিয়ার। পৈত্রিক ভিটামাটি, কয়েক শতাংশ জমি, হালের দুটো গরু ছাড়া আর কি আছে সম্বল। টিপটিপানি বৃষ্টির পানিতে ঘুম আসেনা ছবুর মিয়ার, কাঁথাবালিশ ভিজে চুপসে থাকে,  পান্তাভাতে পোড়া মরিচ কচলে পরম তৃপ্তি নিয়ে খেয়ে হালের গরু দুটো নিয়ে জমি চাষ দিতে বের হয়ে যায় সাতসকালে। হাকিম চাচার ট্রাক্টর মেশিন আছে বড় কারবার তার, ওদের সাধ্য নেই এসবের। এবার ফসল ভালো হলে ঘরে নতুন টিন লাগাতে হবে, মেয়েটারে নতুন ছাতা কিনে দিবে, বউটার হাতে চুড়ি নাই কেমন যেন খালি খালি লাগে, এইবার ধানের দাম উঠলে বউরে একজোড়া শাড়িও কিনে দিবে, মই দিতে দিতে ভাবছে ছবুর মিয়া। নিজের জন্যে নাইবা কিনল কিছু, সারাদিনের পরিশ্রম শেষে ঘরে ফিরে ওদের হাসিমুখ দেখলে সারাদিনের পরিশ্রম উবে যায়। গোধূলি নেমে এলো পশ্চিমাকাশে, হাকিম চাচার মেশিনের শব্দ আর শোনা যাচ্ছেনা, দূরের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে, কাদামাখা গামছাখানা বিলের পানিতে ধুয়ে অযু করে আইলের উপর নামাজ পড়ে নিয়ে বাড়ির দিকে হাটতে লাগল ক্লান্ত শরীরে, এবার মেয়েটা যদি ভালো কলেজে চান্স পায় হালের গরু বিক্রি করে সেখানে ভর্তি করাবো, মেয়ে আমার মানুষ হোক, ফেরার পথে মাস্টার মশাইয়ের সাথে দেখা- কি খবর ছবুর মিয়া? তোমার মেয়ে তো মাশাল্লাহ আমাদের স্কুলের গর্ব, সব ক্লাসে ফার্স্ট, এবার এ+ প্লাস এর তালিকায় সালমাকেই ধরছি আমরা।

–সবই আপনাগো দোয়া মাস্টারমশাই!  তয় মেয়েডা ম্যালা খাটনি করে পড়ে রাইতের বেলা, মেয়েডা ভালো পাস করুক এইডাই চাই।

গরু দুটো গোয়ালে বেধে হাতমুখ ধুয়ে তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকল সে,

— কইগো সালমার মা!  সরিষার বোতল টা নিয়া এদিকে আহো, মাস্টারমশাই কি বলছে জানো? আমাগো সালমা নাকি এইবার ভাল পাস দিবো।

খুশিতে চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে উঠলো রেহেনা বানুর। অশ্রু ছুটে এলো একধরনের আত্মতৃপ্তিতে।

এই দেহেন চোখে কি ঢুকলো আবার, আঁচলে চোখ মুছে বলল :

–আইজকা টিপু শোউল মাছ ধইরে আনছে বিল থেইক্কা, ভাত আনতেছি আরাম কইরা বহেন।

ছবুর মিয়া মনে মনে ভাবতে লাগল বড়ই সরল রেহু- বিশবছর ধরে সংসার করে যাচ্ছে কোন চাওয়া নেই এই সংসারে।

— একদিন পয়সা হলে স্বর্ণের একজোড়া কানের দুল বানাইয়া দিমু, বউটা বড় খুশি হইবো, সেই ষোড়শী বয়সের চান্দের লাহান মুখের হাসি আরেকবার দেখবার পারুম।

সবুজ হয়ে উঠছে মাঠ, মাঠে গেলে পরাণ ভরে উঠে ছবুর মিয়ার, এবার ফসল বোধহয় ফি বছরের থেকে ভাল হবে, হাত দিয়ে স্পর্শ করছে সে বুকসমান বেড়ে উঠা ধানের চারা গুলোকে, ঠিক যেমন মমতা দিয়ে একজন মা তার সন্তানের গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়! প্রশান্তিতে বুক ভরে যাচ্ছে ছবুর মিয়ার। অনেক পরিশ্রম গেছে এই ক্ষেতের পিছনে, নাহ! এই পরিশ্রম বৃথা যাবেনা, এবার আল্লাহ তাদের মুখপানে তাকাবেন।

— শোনো রেহু! ক্ষেতের দিকে তাকাইলে পরাণ জুড়াইয়া যায়, তোমারে এইবার স্বর্ণের একজোড়া দুল দিমু!

লজ্জায় লাল হয়ে গেল এই বয়সেও এই কথা শুনে রেহেনা বানুর।

— কিযে কননা, আপনে! সালু টিপু গো পড়নের খরচ দেওন লাগবেনা? আপনে মনে নাই মাস্টারমশাই কি বলল সেদিন, আমাগো সালমা এইবার ভালো পাস দিব। টিপুরে একটা স্কুলের ব্যাগ দিয়েন এইবার কিনে আর সালমারে একটা ঘড়ি দিবেন। আমার জন্যে কিছু লাগবেনা।

শ্রাবণের মাঝামাঝি সময়, হঠাৎ একদিন ঘোর অন্ধকার নামল আকাশজুড়ে। গুড়ুম গুড়ুম মেঘের শব্দ শুরু হল, জোরে বাতাসে ঘরখানা দুলছে যে কোন সময় উপড়ে পড়ে যেতে পারে, একি বৃষ্টির ফোয়ারা নামল আকাশ থেকে, এবার কি তাইলে বন্যা হবে!

রাত যত গভীর হচ্ছে ঝড়ের তাণ্ডব বেড়েই চলছে, মানুষের চিল্লানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে।

— হায় আল্লাহ! কি হবে আমাগো, জোয়ারের পানিতে নদীর বাণ ছুটে গেল!

ক্ষেতখামার তলিয়ে যাচ্ছে, বৃষ্টি বেড়েই চলছে, হঠাৎ বজ্রপাতের শব্দে কানের তলি ফেটে যাওয়ার অবস্থা, হঠাৎ ঝনাৎ করে এক দমকা বাতাসে উড়িয়ে নিল দোচালা টিনের জঙ ধরানো টিন, ভেঙ্গে পড়ল খুটি! ছবুর মিয়া বুঝতে পারল না এই বাতাস ঘর উড়িয়ে নিল নাকি তার স্বপ্ন? নদীর বাণ ছুটে গেল নাকি তার পাঁজরার হাড়?  পানিতে ফসল নষ্ট হল নাকি তার বেঁচে থাকার সম্বল? শুধু শুনা গেলো, রেহু সব শেষ!

আরিফা সানজিদা

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

https://www.facebook.com/mou739326

Next Barisal banner ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *