দুর্নীতিবাজরা যখন বেপরোয়া, রোজিনারা তখন কারাগারে

আযাদ আলাউদ্দীন ।।
.
আমি দৈনিক নয়া দিগন্ত এবং প্রথম আলোর নিয়মিত পাঠক। প্রতিদিন বাসায় রাখা পত্রিকা দুটি খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ার চেষ্টা করি। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে মিডিয়া কেন্দ্রিক লিখিত-অলিখিত নানামুখী অদৃশ্য চাপ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- এইসব বহুরকম বাঁধার মধ্যেও পত্রিকা দুটি পেশাদারিত্ব বজায় রেখে নিয়মিত জনগণের জন্য কাজ করে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রথম আলো অনেক বেশি পেশাদার। এর প্রধান কারণ হচ্ছে- প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও কর্মিদের শ্রমের আন্তরিক মূল্যায়ন।
.
বাংলাদেশে দুর্নীতি সমাজের স্তরে স্তরে এমনভাবে ছড়িয়ে গেছে যে- দুর্নীতিবাজদের সংখ্যা এখন অনেক বেশি এবং তারা নিজেদের দুর্নীতির ক্ষেত্রে পরস্পর ঐক্যবদ্ধ। যে কারণে তারা নিউজ সংশ্লিষ্ট তথ্য চেপে রাখতে চান। তারা কোনভাবেই চান না প্রকৃত তথ্য জনগণের সামনে চলে আসুক, অথচ তথ্য জানা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। ‘অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট’র আওতাধীন কিছু তথ্য ছাড়া- সকল তথ্যই জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
.
এবছর বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো- ‘তথ্য জনগণের পণ্য’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘তথ্য’ এখনো জনগণের ‘পণ্য’ হতে পারেনি।  যাই হোক- দুর্নীতিবাজদের চেপে রাখা তথ্যগুলো কৌশলে সংগ্রহ করা, আনুষঙ্গিক প্রমাণাদি হাতে আনা, সবশেষে অভিযুক্তদের বক্তব্য সংগ্রহ- এরপর নানামুখী প্রলোভন, চাপ ও হুমকি উপেক্ষা করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যে, কতটা কষ্টকর তা সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরাই ভালোভাবে উপলব্দি করতে পারেন।
.
রোজিনা ইসলাম- আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অন্যতম একজন সেরা অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা স্মারকে স্বর্ণ জালিয়াতি নিয়ে তার লেখা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘ষোল আনাই মিছে’ দেশে বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়ে তার লেখা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক আমলা ও দুর্নীতিবাজের মুখোশ উন্মোচন করেছে।
.
সে কারণে এদের একটি অংশ তার উপর ক্ষুব্ধ থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পেশাগত দায়িত্বপালনকালে তাকে ৫ ঘন্টা এভাবে হেনস্থা ও নির্যাতন করা, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়া, হাসপাতালে নেয়ার কথা বলে থানায় নেয়া, রাতভর থানায় রেখে সকাল ৮টার মধ্যে আদালতে নিয়ে সেখানে হাজতখানায় তিনঘন্টা রাখা, ৫ দিনের রিমান্ড চাওয়া, অবশেষে কারাগারে প্রেরণ- সবকিছুই স্বাধীন সাংবাদিক সমাজের জন্য অবমাননাকর। সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বোনের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম বলেছে- অতীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দুর্নীতির খবর প্রকাশ করায় তাকে এভাবে হেনস্থা করে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মামলা করা হয়েছে। মামলাটি ষড়যন্ত্রমূলক ও মিথ্যা বলে দাবি করেছেন সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের আইনজীবী। এসব ঘটনার পেছনে দুর্নীতিবাজ আমলাদের একটা ‘ছক’ কাজ করছে বলে সাংবাদিকদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে।
.
বাংলাদেশে আমলারা যেখানে জনগণের সেবক হয়ে কাজ করার কথা, সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। যেখানে বলা হয় ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ সেখানে বাস্তব ক্ষেত্রে ঘটছে তার উল্টোটা। জনগণ যেখানে রাষ্ট্রের মালিক হওয়ার কথা- এখন যেন আমলারাই রাষ্ট্রের মালিক!
আর নিজেদের ক্ষমতার মসনদ কুক্ষিগত করে ধরে রাখার জন্য আমলাদের এসব দুর্নীতির ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার সাহস রাখেন না সরকার। কারণ তারা এখন আমলাদের নিকট অলিখিতভাবে অনেকটাই দায়বদ্ধ !
.
ভূয়া প্রকল্প তৈরি করে একের পর এক রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, প্রকল্প পরামর্শক নিয়োগের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া, এক বছরের কাজ- দশ বছরে শেষ করে প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো, ব্যাংক ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা, বিদেশে অর্থ পাচারসহ বহু অপকর্মে অনেক রাজনৈতিক নেতা ও আমলা মিলেমিশে একাকার। টিআইবির প্রতিবেদনে এসব চিত্র বারবার ফুটে উঠলেও দুর্নীতিবাজদের সম্মিলিত ঐক্যের খেসারত দিচ্ছে দেশের জনগণ।
.
দেশে জনগণের পক্ষের শক্তিশালী কোন বিরোধীদল না থাকায় এসব অন্যায় অপরাধের জোরালো কোন প্রতিবাদও হচ্ছে না।
অনেক মিডিয়ার মালিক সরকারি দলের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকায় তারাও অনেকটা ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’ অবস্থা।
সাংবাদিক সংগঠনগুলো সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল সমর্থিত ধারায় বিভক্ত হওয়ায় পুরো সুযোগ নিচ্ছে অসৎ রাজনীতিবিদ আর আমলারা।
 .
পেশাদার ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম ইস্যুতে বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ যেভাবে সোচ্চার ও প্রতিবাদ মুখর হয়েছেন- এই ধারা অব্যাহত থাকলে দুর্নীতিবাজদের টনক নড়বে বলে আশা রাখি।
ইতোমধ্যে সাংবাদিকরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বর্জন করা শুরু করেছেন, তবে আমি বলবো- তাদের ইতিবাচক সংবাদ বর্জন করলেও দুর্নীতির নেতিবাচক সংবাদ জনসম্মুখে তুলে ধরে ওদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে।
জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন সহ সারাদেশের সব সাংবাদিক সংগঠন এই ঘটনার প্রতিবাদে মিডিয়া ও রাজপথে যেভাবে সরব রয়েছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামসহ নির্যাতিত সাংবাদিকরা ন্যায় বিচার পাওয়ার পাওয়ার প্রত্যাশায় থাকবেন।
.
দৈনিক প্রথম আলো’য় প্রকাশিত সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের লেখা কয়েকটি আলোচিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পেপার কাটিং
.
.
.
আযাদ আলাউদ্দীন
বরিশাল ব্যুরো চিফ
দৈনিক নয়া দিগন্ত 
০১৭১২১৮৯৩৩৮ 
Next Barisal banner ads

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *