বাংলা সাহিত্যে বখতিয়ার

 

১৯৯৭ সালে জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশে মুসলিম বিজয় বার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস. এম. লুৎফর রহমান বলেন, বখতিয়ারের বঙ্গ বিজয়ের ৭৯৩ তম বার্ষিকী উদযাপনের এ আয়োজনকে আমি মোবারকবাদ জানাচ্ছি। আমি খুশি হতাম যদি এই অবস্থা ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু হতো। আমি খুশি হতাম যদি ১৯৭১ সালে তা শুরু হতো। আমি তবুও খুশি হয়েছি অন্তত ’৯৭ সালে হলেও তা শুরু হয়েছে। আমাদের উপর মিথ্যা ইতিহাস চাপিয়ে দেয়ার যে তোড়জোর চলছে তা প্রতিরোধে এ ধরনের আলোচনা সভা তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের আত্মচেতনাকে ভুলুণ্ঠিত করার জন্য যে প্রচেষ্টা চলছে, সে প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করবার জন্য এ আয়োজন একটি যথার্থ আয়োজন। (প্রথম প্রভাত, বঙ্গবিজয়ের ৭৯৩ তম স্মারক, পৃ ১০৪)

এই বরেণ্য ভাষাবিদের মনস্কামনা পূরণ হয়নি। ওই একবার ছাড়া বখতিয়ার বার্ষিকী অতীতেও হয়নি। পরবর্তীতেও হয়নি। আমরাও তার সুরে সুর মিলাব। তবে সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে কেন্দ্র করে। বিগত ৮০০ বছরে বখতিয়ারের মহাবিজয় নিয়ে মহাকাব্য, কাব্য, ছড়া, পদ্য, গদ্য, গল্প, উপন্যাস, আখ্যান, উপখ্যান, থ্রিলার, টেলিফিল্ম, চলচ্চিত্র নাটক, নাটিকা ইত্যাদি আশানুরূপ কেন রচিত হয়নি? শিল্পীর তুলিতে, কবির কবিতায়, কলম সৈনিকের কলমে, নাট্যকারদের নাটকে ঠাঁই পায়নি বখতিয়ারের বিজয়গাঁথা। অথচ বখতিয়ারই এ জাতির উৎসাহ উদ্দীপনার কেন্দ্র, আশা প্রত্যাশার প্রতীক, মূলশক্তি, পথ প্রদর্শক, ক্রান্তিকালের নকিব, প্রেরণার বাতিঘর, মহাবিপদের মহানায়ক, সম্মুখ সমরের সিপাহসালার। কবি আল মাহমুদ বলেন, ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনের জুলুম নিপীড়নে বাংলার সকল শ্রেণি, সকল ধর্মের ও সকল সম্প্রদায়ের মানুষের দৃর্বিসহ হয়ে উঠেছিল। তখন ইমানি চেতনায় উদ্দীপ্ত বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয় বাংলার মানুষকে নতুন জীবনের সন্ধান দিয়েছিল। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয়েরই ফসল। বখতিয়ার খলজি আক্রমণকারী নয়, তিনি নাযাতকারী। (প্রথম প্রভাত, বঙ্গবিজয়ের ৭৯৩ তম স্মারক, পৃ ১০৪)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর ড. রিচার্ড বি. ইটন বিষয়টির স্বীকৃতি দিয়েছেন এভাবে। তিনি লিখেছেন, ‘এই ঘটনা স্বতন্ত্রভাবে ব্যতিক্রম কিছু নয়, কারণ প্রায় একই সময় থেকে অষ্টাদশ শতাব্দি পর্যন্ত সার্বভৌম মুসলিম শাসকরা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় পুরোটাই শাসন করতেন। অবশ্য, ব্যতিক্রম হলো ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রদেশগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র বাংলাতেই অঞ্চলটি মোটামুটিভাবে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের মোট আয়তনের সমান। স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকাংশ সদস্য শাসকশ্রেণীর ধর্ম ইসলামকে গ্রহণ করেছিলো। এটা ছিলো চরম পরিণতিসূচক ও বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে প্রমাণিত; কারণ মুসলমান জনসংখ্যর উপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতকে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টি করে। বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলো নিয়ে গঠিত পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের অধীনে থাকে। … বাঙালিরা বর্তমানে আরবদের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলমান জনগোষ্ঠী। (রিচার্ড বি. ইটন: ইসলামের অভ্যুদয় এবং বাংলাদেশ, পৃ ১৬-১৭) বাংলাদেশের মুসলিম অধিবাসীরাই পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিলো। পাকিস্তান ভেঙ্গে তারাই আবার বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছে। এই কৃতিত্ব বখতিয়ার খলজিরই প্রাপ্য।

আজ যারা বখতিয়ারের সমালোচনা করে, গিবত গায়, যারা বখতিয়ারকে আক্রমণকারী ও লুটেরা হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়, যারা বখতিয়ারের বিপক্ষ শক্তি তারা মূলত বাংলাদেশকেই স্বীকার করে না। তারা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের তল্পিবাহক ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের দোসর। এইসব মতলববাজদের হাতে বর্তমান দেশের নিয়ন্ত্রণ শক্তি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, সত্যকে হায় হত্যা করে অত্যাচারীরা খাড়ায়/নেই কিরে কেউ সত্য সাধক বুক খুলে আজ দাঁড়ায়।  ক্ষমতাধর কৃষ্ণীয়দের কবল হতে দেশকে উদ্ধার করতে হলে বখতিয়ারের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে। তাহলেই লক্ষ্মণসেনদের উত্তরসূরীদের নিপাত করা সম্ভব। বখতিয়ার বঙ্গ, বাঙালি, বাংলাদেশ এক এবং অবিভাজ্য। নায়ক বখতিয়ার যে ধারার সূচনা করেছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার পরিসমাপ্তি টানেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক মাসুদ মজুমদার বলেন, বাংলাদেশে ইসলামের আনুষ্ঠানিক অভিযাত্রার সময়কাল ৮০০ বছর। আমরা ৮০০ বছরের সমৃদ্ধ ইসলামি সংস্কৃতির ঐতিহ্য লালন করছি। যদি বখতিয়ার না আসতেন বঙ্গ উচ্চারিত হয়তো হতো না। সুবে বাংলার কথা বলা যেত না। সাতচল্লিশ সালে দেশ বিভক্তির প্রশ্ন উঠতো না। একাত্তরের গর্বের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ হতো না। (প্রথম প্রভাত, বঙ্গবিজয়ের ৭৯৩ তম স্মারক, পৃ ১১১)

মালিক-উল-গাজি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খলজি ইতিহাস সৃষ্টিকারী একজন মহানায়ক। ইতিহাসে আর কোনো সেনাপতি মাত্র ১৭ জন মুজাহিদ নিয়ে কোনো রাষ্ট্র জয় করেছেন এমন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। অথচ বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবস্থান দাবির তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। একটি উপন্যাস, একটি কাব্যগ্রন্থ, দুএকটি নাটক এবং কিছু বিচ্ছিন্ন ছড়া কবিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ বখতিয়ারের জয়যাত্রা নিয়ে রচিত হতে পারত মহাকাব্য। চিত্রায়িত হতে পারত কালজয়ী সব চলচ্চিত্র। জাতি হিসেবে এটা আমাদের ব্যর্থতা।

বখতিয়ারের ওপর বাংলাভাষায় একমাত্র উপন্যাস ‘বখতিয়ারের তলোয়ার’। ইহা রচনা করেন ইতিহাস ও শেকড় সন্ধানী কথাসাহিত্যিক শফিউদ্দীন সরদার (জন্ম ০১ লা মে ১৯৩৫, নাটোর)। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। প্রকাশক মদিনা পাবলিকেশানস, বাংলাবাজার ঢাকা। উপন্যাসটির ভূমিকা লিখেন প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী, ভাষা সৈনিক ও তমদ্দুন মজলিস সভাপতি আবদুল গফুর। ভূমিকায় তিনি বলেন, সারা দুনিয়ায় চলছে এখন শেকড় সন্ধানের পালা। চলছে বাংলাদেশেও।—-বখতিয়ার খলজিকে নিয়ে গর্ব করে না, এমন মুসলমানের কথা কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু এই বখতিয়ার খলজিকে তাঁর সমকালীন ইতিহাসকে আমরা এতটুকু জানি? অথচ সমকালীন ইতিহাসের প্রেক্ষাপটের বিচার ছাড়া কারও পূর্ণাঙ্গ পরিচয় উপলব্ধি করা কোনো মতেই সম্ভব নয়। ঐতিহাসিক উপন্যাস বা নাটকে এই উপলব্ধি যত সহজে সঞ্চার করা যায় অন্য কোনভাবে তা সম্ভব নয়। বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয়ের পটভূমিতে নাটক লিখেছেন প্রথিতজশা নাট্যকার আসকার ইবনে শাইখ একটি নাট্য সিরিজের অংশ হিসেবে। কিন্তু উপন্যাসে আমাদের ইতিহাসের এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পালন করেছেন শফীউদ্দিন সরদার। (শফীউদ্দিন সরদারঃ বখতিয়ারের তলোয়ার, পৃ ৩-৪) বখতিয়ারের তলোয়ার উপন্যাসটি ১১ অনুচ্ছেদে খতম (সমাপ্ত)। মুঈজউদ্দিন মুহাম্মাদ ঘুরির ভারত অভিযান, পৃথ্বিরাজের পরাজয়, বখতিয়ারের নদিয়া-লাখনৌতি জয়, তিব্বত অভিযান, আলি মেচের ধর্মান্তর ও পথপ্রদর্শন, তিব্বত জয়ে ব্যর্থ, ফিরতি পথে কামরুপ রাজার প্রতারণা ও আক্রমণ, সৈন্যক্ষয়, নদী পাড়াপারে সৈন্যডুবি, দেওকোটে প্রত্যাবর্তন ও মৃত্যু ইত্যাদি ঘটনা পরম্পরার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণই শফীউদ্দিন সরদারের ‘বখতিয়ারের তলোয়ার’ উপন্যাসের স্বার্থকতা।

প্রফেসর আসকার ইবনে শাইখ বখতিয়ারের বঙ্গ বিজয় নিয়ে নাটক লিখেন অশ্বারোহী। এটি তার রাজ্য রাজা রাজধানী নাট্যসিরিজের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৮২ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে এ কিতাবটি প্রকাশিত হয়। রাজ্য রাজা রাজধানী নাট্যসিরিজের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম নাটক ‘অশ্বারোহী’। সাতটি দৃশ্যে নাটকটি সমাপ্ত। নদীয়া জয়ের প্রেক্ষাপট, সমকালীন সামাজিক অস্থিরতা, লক্ষ্মণসেনের রাজদরবারের চিত্র, বখতিয়ারের নদীয় বিজয় নাটকের উপজীব্য। চরিত্রসমূহ: লক্ষ্মণসেন, হলায়ুধ মিশ্র, উমাপতিধর, গোবর্ধন, শরন, ধোরী, কবি জয়দেব, রন্নাদেবী, পদ্মাদেবী, হাবিব, মাহবুব, প্রধান ফকির, তবরেযি, পিতা, সুভদ্রা, নিযামুদ্দিন, সমসামুদ্দিন, মুহাম্মাদ বখতিয়ার, ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণের পুত্র ও অন্যান্য। কেন বখতিয়ারের বঙ্গবিজয়? নাট্যকার ড. আসকার ইবনে শাইখ বখতিয়ারের মুখ থেকে উচ্চারন করাচ্ছেন, ‘এখানে মানুষ ধুঁকে ধুঁকে মরে। এখানে শয়তান মুক্ত-স্বাধীন! এখানে কুফর, যুলুম, জেহেল! যুগ যুগ ধরে, বকুফাটা কত দীর্ঘ-নিঃশ্বাসে এখানে অসীম জ্বালা! কত বিক্ষোভ জমে জমে এখানে আগ্নেয়গিরি! এখানে এসেছে কুরআনের আলো। নেভাতে চেয়েছে শয়তানি ঝড়! এস, জাগ্রত করি আগ্নেয়গিরি! হাতে নাও নেযা, নাঙ্গা তলোয়ার!! জীবন এখানে জাগ্রত হোক!! (ড. আসকার ইবনে শাইখ: রাজ্য রাজা রাজধানী, পৃ ৩১৭-৩১৮) মুসলমান মুজাহিদদের বাংলা অভিযান নিয়ে আর একটি নাটক রচনা করেন আলহাজ¦ সৈয়দ আলী আহম্মদ ‘বঙ্গ বিজয়’ শিরোনামে।

বখতিয়ারের স্মরণে বাংলাভাষায় রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবি আল মাহমুদের একটি শ্রেষ্ঠকীর্তি। এছাড়া কবিতা লিখেন গোলাম মোস্তফা ‘বঙ্গ বিজয়’ (কাব্য কাহিনীর অন্তর্ভুক্ত), মুফাখখারুল ইসলাম ‘বখতীয়ার খিলজী’র রচনাকাল ২৫ মে, ১৯৪৬, কালিগঞ্জ, ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ, কলিকাতা, মতিউর রহমান মল্লিক ‘খিলজির উল্লেখ’, আল জাকির ‘খিলজির বিজয়’, শামসুল করীম খোকন ‘জাগে বখতীয়ার’। এছাড়া দ্বীজেন্দ্র লাল রায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় যা রচনা করেছেন সেগুলো নিতান্তই সাম্প্রদায়িকতায় পূর্ণ।

বর্তমান দেশের লেখকদের উচিত হবে বখতিয়ারের কৃতিত্বকে তাদের কবিতা, নাটক, উপন্যাস, গল্প, সাহিত্যে বেশি করে স্থান দেয়া। জাতির শেকড়কে ভুলে কেউ বড় হতে পারে না। বখতিয়ার খলজিই বাঙালি ও বাংলাদেশি নাগরিকদের শেকড়। এ উপলব্ধি থেকে একাডেমিক পাঠ্যপুস্তক, গণমাধ্যম, সাহিত্যকর্মে বখতিয়ারের বিজয় গাঁথাকে মহিয়ান করে তুলতে হবে।

দোহাই :
১। প্রথম প্রভাত, বঙ্গবিজয়ের ৭৯৩ তম স্মারক, ধানমন্ডি ঢাকা, জানুয়ারি ১৯৯৭
২। শফীউদ্দিন সরদারঃ বখতিয়ারের তলোয়ার, মদীনা পাবলিকেশানস, বাংলাবাজার ঢাকা, সপ্তম সংস্করণ, মার্চ ২০১১
৩। ড. আসকার ইবনে শাইখ: রাজ্য রাজা রাজধানী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, দ্বিতীয় সংস্করণ এপ্রিল ২০০৫
৪। আল মাহমুদের কবিতা, হরফ সংস্করণ, ২৫ শে মে ১৯৮৪, কলকাতা ৭০০০১৯
৫। রিচার্ড বি. ইটন: ইসলামের অভ্যুদয় এবং বাংলাদেশ, হাসান শরীফ অনূদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, জুন ২০০৮
৬। ছবি, ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত

Next Barisal banner ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *