বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির পাঁচ দিকপাল

মুন্সী এনাম

রামাই পণ্ডিত
রামাই পণ্ডিত আদি বাঙালি কবি। তাঁর সঠিক জন্ম তারিখ জানা যায়নি। ধারণা করা হয় যে, ১৩শ শতকের গোড়ার দিকে তাঁর জন্ম। শূণ্য পুরাণ নামক বৌদ্ধ ধর্মের ধর্ম পুজা সংক্রান্ত পুরাণ রামাই পন্ডিত রচনা করেন।
নগেন্দ্রনাথ বসু তিনটি পুঁথি পাঠ সংগ্রহ করে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘শূন্য পুরাণ’ নামকরণ করে গ্রন্থ প্রকাশ করেন। শূণ্য পুরাণ কিতাবটি ৫১টি অধ্যায়ে বিভক্ত। শূণ্য পুরাণে নিরঞ্জনের রুষ্মা বা কলিমা জাল্লাল নামে একটি অংশ আছে। ভাষা বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম লুৎফর রহমানের মতে, এই কলিমা জাল্লালই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন।

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী
সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, বাগ্মী, সমাজ সংস্কারক, ইসলাম প্রচারক, রাজনীতিক, নারী শিক্ষাব্রতী নেতা, গীতিকার। বহুমুখি প্রতিভার সুষম সমন্বয় ঘটেছিল এই বরেণ্য সাহিত্যিকের জীবনে। ১৮৮০ সালের ১৩ জুলাই কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজী সিরাজগঞ্জ জেলায় মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। সিরাজীর প্রথম কাব্যগন্থ অনল প্রবাহ। কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী ও সংগীত বিষয়ে তাঁর রচিত পুস্তক সংখ্যা ৩২। কাব্যসমগ্রের মধ্যে রয়েছে অনল প্রবাহ, উচ্ছ্বাস, নব উদ্দীপনা, উদ্বোধন, স্পেন বিজয় কাব্য, মহাশিক্ষা কাব্য, সুধাঞ্জলী, গৌরব কাহিনী, কুসুমাঞ্জলী, আবে হায়াৎ, কাব্য কুসুমোদ্যান, পুষ্পাঞ্জলী প্রভৃতি। উপন্যাসসমূহ হলো রায়নন্দিনী, তারাবাঈ, ফিরোজা বেগম, নূরউদ্দীন, বঙ্গ ও বিহার, জাহানার। প্রবন্ধগ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে মহানগরী কার্ডোভা বা স্পেনীয় মুসলমান সভ্যতা, স্ত্রীশিক্ষা, আদব কায়দা শিক্ষা, সুচিন্তা, তুর্কী নারী জীবন, কারা-কাহিনী, মুক্তির বানী, বিবিধ প্রবন্ধ প্রভৃতি। সঙ্গীত সঞ্জীবনী ও প্রেমাঞ্জলী কবির সংগীত বিষয়ক গ্রন্থ অনল প্রবাহ। কাব্যগ্রন্থে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিষোদগারের অভিযোগে ১৯১০ সালের মার্চ মাসে কবির বিরুদ্ধে মামলা হয়। ৯ সেপ্টেম্বর ২ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেয় আদালত। এ ১৯১২ সালে ১৪ মে কবি হাজারীবাগ জেল থেকে মুক্তি পান। ১৭ জুলাই ১৯৩১ তারিখে কবি ইন্তেকাল করেন।

মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ
সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, ইসলামি চিন্তাবিদ মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ’র জন্ম ১৮৬৮ সালের ৭ জুন পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার হাকিমপুর গ্রামে জন্ম। পিতা মাওলানা আবদুল বারী খাঁ। তাঁর পূর্ব পুরুষ ছিলেন যশোর-খুলনা সীমান্তের পয়গ্রামের বাসিন্দা কামাল উদ্দীন খাঁ। পনেরো শতকে জয়দেব নামক এক ব্রাক্ষণ হিন্দুধর্ম ছেড়ে কামাল উদ্দিন খাঁ নাম ধারণ করে মুসলমান হন। আকরম খাঁ ১৯০০ সালে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বাংলা ছাড়াও তিনি আরবি, ফার্সি, উর্দু, ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষায় সুপ-িত ছিলেন। মোহাম্মদ আকরাম খাঁ অল্প বয়সেই সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯০৩ সালে তাঁর সম্পাদনায় কলকাতা থেকে মাসিক মোহাম্মাদী প্রকাশিত হয়। ১৯০৮ সালে এটি সাপ্তাহিকে ও ১৯২১ সনে দৈনিকে রূপান্তরিত হয়। ১৯১৫ সালে প্রকাশ করেন আঞ্জুমান ওলামা’র মুখপত্র মাসিক আল-এসলাম। ১৯২০ সালে উর্দু দৈনিক জামানা ও ১৯২১ সালে দৈনিক সেবক তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। সেবক পত্রিকায় অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে এক শক্তিশালী সম্পাদকীয় লেখার দায়ে ১৯২১ সালে তাঁকে গ্রেফতার কারা হয়। শাস্তিস্বরূপ সরকার এক বছর কারাদ- দেন ও সেবক পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর তাঁর উদ্যোগে প্রকাশিত হয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্র দৈনিক আজাদ। বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে দৈনিক আজাদের অবস্থান শীর্ষস্থানে। সেদিন আকরম খাঁ’র নেতৃত্বে একঝাঁক সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেছিলেন কলমযুদ্ধে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দৈনিক আজাদের ভূমিকা চিরস্মরণীয়। ১৯৪০ সাল থেকে এর সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন কিংবদন্তি কলম সৈনিক আবুল কালাম শামসুদ্দিন।
উপমহাদেশের মুসলিম সাংবাদিকতার জনক আকরম খাঁ। অবিভক্ত বঙ্গে মুসলিম জাগরণের আন্দোলনে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। দীর্ঘ ঘটনাবহুল জীবনে সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা গদ্য সাহিত্যেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। বাংলা গদ্য সাহিত্যের একজন শক্তিশালী শিল্পী হিসেবে অনেকগুলো গবেষণাধর্মী ও ধর্মীয় গ্রন্থ রচনা করেছেন। এছাড়া রাজনীতি, ইতিহাস ও সমাজচিন্তামূলক পুস্তকাদি রচনায়ও তিনি পারদর্শিতার স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, মোস্তফা চরিত, তফসিরুল কোরআন, সমাজ ও সমাধান, মুক্তি ও ইসলাম প্রভৃতি। ১৯৬৯ সালে ১৮ আগস্ট ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। ঢাকার বংশালের আহলে হাদিস মসজিদ সংলগ্ন গোরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

সুর সম্রাট আব্বাসউদ্দীন
বাংলা ইসলামি সংগীতের জনক আব্বাসউদ্দীন আহমদের জন্ম ১৯০১ সনের ২৭শে অক্টোবর কুচবিহারে। বাংলার লোক সংগীত, ভাওয়াইয়া, মারফতি, কওমি, মুর্শিদি গানকে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গণে তুলে ধরেছেন স্বমহিমায়।
আবহমান গ্রাম বাংলার চিরায়ত সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও ঐতিহ্যকে নিখুতভাবে ফুটে ওঠেছে তাঁর কন্ঠে। এজন্যই তিনি মানুষের মনের গভীর মানসপটে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর একমাত্র সাহিত্যকর্ম ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’ ঢাকা স্টান্ডার্ড পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সনে। বইটি দারুণ সুখপাঠ্য। ১৯৫৯ সনের ৩০শে ডিসেম্বর বাংলার বুলবুল আব্বাস উদ্দীন আহমদ ঢাকায় ইন্তেকাল করেন।

অধ্যাপক শাহেদ আলী
অনন্য প্রতিভাধর কালজয়ী কথাশিল্পী মননশিল্পী অধ্যাপক শাহেদ আলী। বাংলাদেশের পটভূমিকায় গল্প সৃষ্টিতে তিনি অসাধারণ পান্ডিত্যের পরিচয় দেন। তাঁর গল্পের মূল উপজীব্য বিষয় মানবতা, মনুষ্যত্ববোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ। গ্রামীণ চালচিত্র, গ্রামের খেঁটে খাওয়া মানুষ এবং আম জনতার জীবনচিত্রের সার্থক রূপায়নে হৃদ্ধ শাহেদ আলীর সাহিত্যকর্ম। তিনিই বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ গল্পকার।
শাহেদ আলীর জন্ম ২৬ মে ১৯২৫ সুনামগঞ্জে। এই বরেণ্য চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিক ২০০১ সালের ৬ নভেম্বর ইন্তেকাল করেন । শাহেদ আলীর রচিত ও প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে একমাত্র পথ, তরুণ মুসলিমের ভূমিকা, ফিলিস্তিনে রুশ ভূমিকা, সাম্রাজ্যবাদ ও রাশিয়া, তরুণ্যের সমস্যা, বাংলা সাহিত্যে চট্টগ্রামের অবদান, তওহীদ, বুদ্ধির ফসল আত্মার আশিষ, ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা, জীবন নিরবচ্ছিন্ন, রুহীর প্রথম পাঠ, ছোটদের ইমাম আবু হানিফা, ওংষধস রহ ইধহমষধফবংয, সোনারগাঁয়ের সোনার মানুষ প্রভৃতি। অনুবাদকর্মের মধ্যে রয়েছে মুহাম্মদ আসাদ রচিত ইসলামে রাষ্ট্র ও সরকারি পরিচালনার মূলনীতি ও মক্কার পথ, কে বি এইচ কোনান্ট রচিত আধুনিক বিজ্ঞান ও আধুনিক মানুষ, হিরোডাটাস রচিত ইতিবৃত্ত ইত্যাদি। তাঁর একমাত্র উপন্যাস হৃদয় নদী ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয়। অন্যান্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে নাটিকা ‘বিচার’, ধর্ম সমাজ সংস্কৃতি বিষয়ক গ্রন্থ জীবন দৃষ্টি সাম্প্রদায়িকতা, ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ বিপর্যয়ের হেতু প্রভৃতি। শাহেদ আলীর প্রকাশিত গল্পগ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে জিবরাইলের ডানা, একই সমতলে, শা’নযর, অতীত রাতের কাহিনী, অমর কাহিনী প্রভৃতি।

Next Barisal banner ads

Leave a Reply

Your email address will not be published.