মহানবির হিজরত থেকে বাংলা সনের জন্ম

চিত্র:Halkhata.JPG

মাহমুদ ইউসুফ

দিন, ক্ষণ, মাস, বছর নিয়ে জীবন পরিক্রমা। সময়ের সাথেই সম্পর্কিত শতাব্দী, সন বা সাল। জীবনের অপর নাম সময়। সময়ই মানব জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। সময় থেকেই দিনপঞ্জি, কালপঞ্জির পয়দা। পৃথিবীতে মানববসতির শুরু থেকেই সময়কালকে হিসেব করতে হচ্ছে মানুষকে। এছাড়া গত্যন্তর ছিলো না। আদি মানব নবি আদমকে সময়ের নিরিখেই ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল থাকতে হত। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখা-প্রশাখা সম্পর্কে আদম ছিলেন পূর্ণ অবগত। তিনিই প্রথম বিজ্ঞানী, প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞানীও বটে। তাছাড়া সালাত সকল নবি-রসুলের ওপরই ফরজ ছিলো। আদমকে সময়ের হিসেব করেই নামাজ কায়েম করতে হতো। সেই সূত্রে বলা যায়, জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্ম আদমের হাতে। তবে সভ্যতার উষালগ্নের সেই সময়পঞ্জি, সৌরপঞ্জি, বর্ষপঞ্জি সম্পর্কে এখন খুব বেশি বলা সম্ভব নয়। আমাদের আলোচনা ইসায়ি পরবর্তী সভ্যতার সময় পরিক্রমা নিয়ে। বিশেষ করে বাংলা সনের উদ্ভব ও বিকাশ প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে এর সাথে হিজরি-ইংরেজি সনও সংযুক্ত হবে।

প্রয়োজনের তাগিদেই বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে যুগ, বছর, মাস, পক্ষ, সপ্তাহ ইত্যাদি গণনার প্রথা প্রচলিত হয়। তারই ফলে দেশে দেশে বিভিন্ন সাল বা অব্দের প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। আল কুরআনের ঘোষণা: ‘আকাশ এবং পৃথিবী সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই বছর গণনার মাস বারটি।’ অহির কিতাবের এ ঘোষণার আলোকেই পৃথিবীর দেশে দেশে সন এবং বছর গণনার নানা পন্থা আবিষ্কৃত হয়েছে। আর পৃথবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে, বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায় যত সন ব্যবহার করছে সবগুলোই ১২ মাসের। আস্তিক-নাস্তিকরা এখানে একই বিন্দুতে মিলিত। বাংলা সন-মাসও এর বাইরে নয়। তবে এর উৎপত্তি নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য আছে।
দ্বাদশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত মুসলিম আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে হিজরি সন অনুসরণ করা হতো। মুঘল সম্রাট আকবর জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে চান্দ্র্য হিজরি বর্ষপঞ্জি এবং সৌর বর্ষপঞ্জিকে সমন্বিত করে নতুন বর্ষপঞ্জি তৈরি করতে বলেন। আকবরের দেয়া আজ্ঞা পালন করে সিরাজীর চিন্তা-চেতনায় যে বর্ষপঞ্জি তৈরি হয় তা শুরুতে ফসলি সন বা ইলাহি সন নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে উহাই বাংলা সন হিসেবে পরিগণিত হয়। সিরাজীর গবেষণার ফলে বাংলা সনের উৎপত্তি ৯৯২ হিজরি বা ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে। সম্রাট আকবর ১৫৫৬ ইসায়ি সনের ১১ এপ্রিল (হিজরি ৯৬৩) মসনদে বসেন। সিরাজি ৯৬৩ হিজরি = ৯৬৩ বাংলা সন সমন্বয় করে গণনা শুরু করেন। বাদশাহ আকবরের সিংহাসনারোহনকে স্মরণীয় রাখার জন্য তিনি হিজরি ৯৬৩ কে ভিত্তি করে বাংলা ৯৬৩ সন চালু করেন। এসব দিক বিবেচনায় বলা যায়, বাংলা সনের শুরু মুহাম্মাদ স. এর হিজরতের সন ৬২২ খ্রিস্টাব্দ, আর তার নবযাত্রা ৯৬৩ হিজরিতে। আমির ফতেহ উল্লাহ বাংলা সন প্রবর্তনের সময় আকবরের সিংহাসনে আরোহনের বছরটি ঠিক রাখেন। কিন্তু বছর শুরু করেন ওই সময়ে হিজরি সনের বছর শুরুর দিন দিয়ে। ওই বছর আরবি মহররম মাস ছিলো গ্রীষ্মকালে। সেই বিবেচনায় ফতেহউল্লাহ সিরাজি বৈশাখকেই প্রথম মাস হিসেবে গ্রহণ করেন। আমরা একইভাবে দেখতে পাই, খলিফা উমার রা. ৬৩৮ ইসায়ি সনে হিজরি পঞ্জিকা গণনার আদেশ দেন, হিজরতের প্রকৃত বছর ৬২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে। এমনকি হিজরতের প্রকৃত দিন অনুযায়ী বছর গণনার শুরু না করে চলতি আরবি মাসের প্রথম দিন ১ মহরম থেকে ওই হিজরি সনের প্রারম্ভ ধরা হয়েছিলো। যারা বলেন, সিরাজি কর্তৃক আকবরের রাজ্যাভিষেক ১৪ ফেব্রুয়ারিকে কেন বর্ষশুরুর দিন বিবেচনায় আনা হলো না, তাদেরকে ইতিহাসের এ সত্যটি মেনে নিতে হবে। বঙ্গাব্দ শব্দটি সেকুলাররা ইদানিং ব্যবহার শুরু করেছে। অতীতে এর ব্যাপক ব্যবহার ছিলো না। বাংলা সন বা বাংলা সালই সুপ্রসিদ্ধ। আর সন আরবি, সাল ফারসি শব্দ। তাই বাংলা সনও মুসলিম সভ্যতা-সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত। বিভিন্ন প্রাচীন পুঁথিতে বঙ্গাব্দকে যবনে নৃপতে শকাব্দ বলা হয়েছে, রাম গোপাল দাসের রসকল্প বল্লীর পুঁথিতেও বঙ্গাব্দকে ‘যাবনী বৎসর’ বলা হয়েছে। এ তথ্য থেকে উপরিউক্ত থিমটি আরও মজবুত হয়। হিজরি বা আরবি ক্যালেন্ডার থেকেই বর্তমান বাংলা সনের উদ্ভব। শামসুজ্জামান খান বলেন, একে বাংলা সন বা সাল বলা হয়। এই সন ও সাল হল যথাক্রমে আরবি ও ফারসি শব্দ। এটা নির্দেশ করছে এগুলো মুসলিম রাজা বা সুলতান কর্তৃক বাংলায় পরিচিত করানো হয়।’ যতীন্দ্রমোহন ভট্রাচার্য বাংলা সাল-তারিখ সম্বন্ধে একজন বড় বিশেষজ্ঞ প-িত ছিলেন। তাঁর মতে, সুলতান হোসেন শাহের সময় বাংলা সন প্রচলিত হয়। বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণার দাবি রাখে।

শশাঙ্ক বাঙালি ছিলেন না, ছিলেন না বাংলার শাসক
শ্রী সুনীল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘বঙ্গাব্দের উৎস’ শীর্ষক কিতাবে নানাভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, শশাঙ্কই আসলে বাংলা সনের প্রবর্তক এবং রাজত্বকালের ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ এপ্রিল সোমবার বৈশাখ বঙ্গাব্দের আরম্ভ। ঐতিহাসিক সুখময় মুখোপাধ্যায়ও একই মত পোষণ করেন। এই মত সম্পর্কে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বলেন, এই মতের স্ব-পক্ষে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই প্রমাণ করতে হবে, শশাঙ্ক ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে এক স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, অন্তত ওই সময়ে স্বাধীন ভাবে রাজত্ব করেছিলেন এর কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই যদিও খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথম ভাগে তার রাজত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য আমাদের আছে।’ রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব ৫২৫ হতে ৬০০ অব্দের মধ্যে বাংলায় রাজত্ব করেন। আরেকটি তথ্যে জানা যায়, দাক্ষিণাত্যের চাণক্যরাজ কীর্তিবর্মন ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষপাদে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ ও মগধ জয় করেন। তাই দেখা যায়, সপ্তম শতকের পূর্বে শশাঙ্কের শাসনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। রাজত্বের প্রমাণ না থাকলে তিনি কীভাবে ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করতে পারেন? এর বাইরে শশাঙ্কের বিষয়টি আমরা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করব।

শশাঙ্ক বাংলা বা বাংলাদেশের নরপতি ছিলেন- বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়। তিনি বাংলাদেশের নয়, গৌড়ের শাসক ছিলেন সপ্তম শতকের গোড়ার দিকে। আর গৌড়, সুবর্ণগ্রাম, রাঢ় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয় চতুদর্শ শতকে। হাজি শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ এই কৃতিত্বের দাবিদার। শশাঙ্কের সময় বাংলা বলতে বুঝাত আজকের ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগ। রাজশাহী, রংপুর সিলেট, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম বিভাগও তখন বাংলার বাইরে ছিলো। বাংলাদেশের আদি ইতিহাসের সার্থক রূপকার মিনহাজ-ই-সিরাজ। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর ‘তবাকত-ই-নাসিরি’ কিতাবের বিভিন্ন স্থানে ‘বঙ্গ’ এর উল্লেখ করেছেন। বঙ্গ বলতে তিনি বাংলার পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল তথা বর্তমান বাংলাদেশকে চিহ্নিত করেছেন। লাখনৌতি, গৌড়, পা-ুয়া, সপ্তগ্রাম অঞ্চল থেকে বঙ্গ বা বাঙলা অঞ্চল ছিলো ভিন্ন। ড. এবনে গোলাম সামাদ বলেন, ‘এক সময় বংগ বলতে কেবল পূর্ববংগকেই বুঝাতো। খুব বেশ দিনের কথা নয়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) তাঁর শর্মিষ্ঠা নাটকের প্রস্তাবনায় লিখেছেন: ‘অলীক কুনাট্য রঙে সজে লোকে রাঢ়ে বঙ্গে/নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।’ অর্থাৎ মাইকেল মধুসূুদনের সময়ও বংগ বলতে প্রধানত বুঝিয়েছে পূর্ববংগকেই।’
শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন, বঙ্গরাজ্য শশাঙ্কের সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল কিনা নিশ্চিত বলা যায় না। খুব সম্ভবত মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি গৌড়, মগধ, দন্ডভুক্তি, উৎকর্ণ ও কোঙ্গোদের অধিপতি ছিলেন। বরিশাল বিভাগের ইতিহাস প্রণেতা সিরাজ উদদীন আহমেদ লিখেছেন, শশাঙ্কের সময় দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গ স্বাধীন ছিলো। সপ্তম শতকের প্রথম ভাগে ভদ্র বংশের রাজরা দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করত।’ এই দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গই ওই আমলের বাংলাদেশ। তাই উহা নিশ্চিত, শশাঙ্ক বাঙালি বা বাঙালি শাসক ছিলেন না। বাংলাদেশ তার শাসন-শোষনের বহির্ভূত এলাকা। বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ, বঙ্গ, বাঙ্গালাহ, বাঙালি জাতি সম্পর্কে তার ন্যূনতম ধারণাও ছিলো না। সুতরাং শশাঙ্ক কর্তৃক বাংলা সন প্রবর্তনের প্রশ্নই উঠে না। তাছাড়া ওই সময় বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতির জন্মই হয়নি। বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও উন্মেষকাল ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে। আর শশাঙ্ক সারা জীবন নিয়োজিত ছিলেন বৌদ্ধ নিধন ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির মূলোৎপাটনে।

ইলিয়াস শাহ ও পরবর্তী মুসলিম শাসকরা খ–বিখ- ও পরস্পর কলহ-কোন্দল পূর্ণ একটি বিরাট এলাকা এবং তার মধ্যে বসবাসকারী দল উপদলে, ধর্মীয় বেড়াজালে বিভক্ত লোকদের একটি জনসমষ্টিকে এক দেশ, এক শাসন, এক পঞ্জিকা, এক জাতি তথা বাঙালি পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। মুসলিম আমলের ‘বঙ্গ’ পরিচয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে। বঙ্গ এ অঞ্চলের রাজ্যগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। মুসলমানরা বরাবরই পলিবিধৌত এ ভূখ-কে অখ-রূপে বাঙালা নামে নির্দেশ করেন। অথচ হিন্দুরা বাঙালা নামের ক্ষেত্রে অখ-তা মেনে নেয়নি। তারা দেশ, ভাষা বা জাতি কোনো অর্থেই বাঙালা ও বাঙালি নামের স্বীকৃতি দেয় নাই। ১৮ শতক অবধি তারা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গকে গৌড় দেশ বা গৌড় বলে এসেছে। ইতিহাস ঘাটলে জানা যাবে, হিন্দু লেখক-বুদ্ধিজীবীরা মৌর্য যুগ থেকে শুরু করে ১৮ শতক অবধি পশ্চিমবাংলাকে গৌড়দেশ বা গৌড় বলে এসেছে, নিজেদের গৌড়িয়া, গৌড়জন, গৌড়ের লোক, গৌড়াই প্রভৃতি বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করছে এবং এদেশের বাঙলা বা বঙ্গাল নাম কখনও মুখে আনেনি বা কাগজে লিখেনি। ওই গৌড়ের অধিবাসীদেরও তারা কখনও বাঙালি বলেননি। গৌড়েশ^র, গৌড়দেশবাসী, গৌড় প্রভৃতির বদলে বাংলাদেশবাসী, বাঙালি, বাঙালেশ্বর, বাঙালা, বাঙালিশ^র তাদের কলমে, মননে, স্মরণে, জবানে, লেখনে অনুপস্থিত। কৃত্তিবাসের তরজমাকৃত রামায়ণে গৌড়েশ্বর বা গৌড় নাম হাজির কিন্তু বাংলা, বাঙালা, বাঙ্গালা গরহাজির। কবি বৃন্দাবন দাসের চৈতন্য ভাগবতে গৌড় শব্দ হাজির, কিন্তু বাঙলা নেই।

সামন্ত পুরোহিত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত শ্রেণি মুসলমানি পঞ্জিকা বা বাঙ্গালা সনও গ্রহণ করেনি। বদলে ব্যবহার করেছে শক সন বা শকাব্দ। কেউ কেউ মল্লাব্দ, লক্ষনাব্দ, পালাব্দ, চৈতন্যাব্দ অনুসরণ করত। হিন্দু সাহিত্যিকরা রচনা করেন বাংলা নামে সংস্কৃত সাহিত্য। নাপছন্দ ছিলো বাংলাভাষা। ভগবান শ্রীচৈতন্যের বাংলা, বাঙালা, বাংলাদেশ, বাঙালিদের সোহবত বা সাহচর্য ভালো লাগেনি। তাই তিনি উড়িষ্যায় শেষ জীবন কাটান। বাংলাবুলিকে বাদ দিয়ে সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন গান কবিতা। সমসাময়িককালের সর্বাধিক খ্যাত কাব্য কৃষ্ণদাস কবিরাজ ‘চৈতন্য চরিতামৃততে’ গৌড়, ওড্র, কাশী, বৃন্দাবন, রাঢ়, পুরী প্রভৃতি স্থানের নাম লিখলেও একবারও বাঙ্গালা নাম লেখেননি। বাঙলা ছিলো তাদের কাছে পরিত্যাজ্য, ঘৃণিত, অবহেলিত, নিন্দিত, অপছন্দনীয়, অরুচিকর। মনে পড়ে হিন্দু বচন ‘ক অক্ষর গো-মাংস’। বাংলা ভাষাকে তারা বলত ইতর ও কাকপক্ষীর ভাষা। এভাবে বিস্তর মেছাল টানা যাবে। পক্ষান্তরে কবি সৈয়দ সুলতান, দৌলৎ উজির বাহরাম খান, নছরুল্লাহ খান, কবি আলাওল, কাজি শেখ মনছুর, হাজি আবদুল মজিদ প্রমুখের কাব্যসাহিত্যে গৌড়, বঙ্গ, বাঙ্গালা সর্ব নাম অন্তর্ভুক্ত। ১৮ শতকের সুফি কবি কাজি শেখ মনছুর তাঁর ছির্নামায় স্পষ্টতই দেশ নামে বাঙ্গালা, জাতি নামে বাঙ্গাল, ভাষা নাম বাঙ্গালা লিখেন। ওই যুগের ঐতিহাসিক ও বিদেশি পর্যটকদের রচনা থেকে রাষ্ট্র নামরূপে ‘বাঙ্গালা’ শব্দের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবহারের নজির মেলে। দেশ কাল রূপে বাঙ্গালা নামটি ৫০০ বছর মুসলমানরা ব্যবহার করে। দেশ বা রাষ্ট্রনাম পরিচয়ে মুসলমানরা নিজেদের দেশ নাম বলত বাঙ্গালা, হিন্দুরা বলত গৌড়। যাদের কাছে বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ এত এলার্জি, তারা কীভাবে বাংলা সনের উদগাতা হয়। তাই উহা সুনিশ্চিত যে, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহ উল্লাহ সিরাজিই বাংলা সনের জনক ও প্রবর্তক এবং আরবি হিজরি সনই বাংলা সনের মূলভিত্তি। আল্লহর রসুল স. এর আবির্ভাব ও তাঁর হিজরত না হলে বাংলা সনের পয়দাই হতো না। ইসলাম, মুহাম্মাদ স. ও আরবি সনের সাথেই বাংলা সন সম্পৃক্ত। এর সাথে পৌত্তলিকতা, শিরক, কুফরিতন্ত্র, মঙ্গলশোভাযাত্রা, বটতলার উচ্ছৃঙ্খলতা, পান্তাইলিশ বা ঢোলবাদ্যের কোনো রিশতা নেই। ইসলামি আইন ব্যবস্থা, কুরআন-হাদিস, মহানবির জীবনাদর্শের আলোকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়াই হোক নববর্ষের চেতনা।

তথ্যপঞ্জি:
১. অধ্যাপক ড. এস. এম. লুৎফর রহমান: বাঙালীর লিপি ভাষা বানান ও জাতির ব্যতিক্রমী ইতিহাস প্রথম ও দ্বিতীয় খ-, ধারণী সাহিত্য-সংসদ, ভেতরবাড়ী লেন, রথখোলা, ঢাকা, প্রকাশকাল- জানুয়ারি ২০০৫
২. সিরাজ উদদীন আহমেদঃ বরিশাল বিভাগের ইতিহাস, ভাস্কর প্রকাশনী, দ্বিতীয় সংস্করণ, ৩১ জুলাই ২০০৩, বরিশাল-ঢাকা।
৩. মামুন তরফদার: বাংলা সনের ইতিহাস : প্রসঙ্গ বাংলা বর্ষ পঞ্জিকা, দৈনিক সংগ্রাম, সোমবার ১৪ এপ্রিল ২০১৪
৪. মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: বাংলা সনের ইতিহাস ঐতিহ্য, দৈনিক সংগ্রাম, শনিবার ২৬ মে ২০১৮
৫. শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার: বাংলা দেশের ইতিহাস, চতুর্থ সংস্করণ, শ্রাবণ ১৩৭৩, কলকাতা, পশ্চিমবাংলা
৬. বাংলাদেশের উৎপত্তি ও বিকাশ, প্রথম খ-, সম্পাদনা পরিষদ, ইফা গবেষণা বিভাগ, ২য় সংস্করণ জুন ২০০৮
৭. ড. এবনে গোলাম সামাদ: বাংলাদেশের আদিবাসী এবং জাতি ও উপজাতি, পরিলেখ, ঘোড়ামারা, রাজশাহী, দ্বিতীয় সংস্করণ, একুশে বইমেলা ২০১৬
৮. বঙ্গাব্দ, মুক্তবিশ্বকোষ, উইকিপিডিয়া, সংগৃহীত: ০৭.০৪.২০১৯

Next Barisal banner ads

Leave a Reply

Your email address will not be published.