যেভাবে সৃষ্টি হলো গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ ভোলা

মো. নুরুল আমিন ।। 

প্রাচীনকালে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী বিধৌত অঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে পলি জমে জমে গাঙ্গের বুকে নতুন আশার আলো ছড়িয়ে জেগে উঠে একটি নতুন চর। একটি দ্বীপ। এরই নাম গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ ভোলা। মানুষের হৃদয়ে জাগে নতুন স্বপ্ন। উত্তর দিক অর্থাৎ বর্তমানের ভোলার দিক থেকে চর পড়া শুরু হয়ে দক্ষিণ দিকে আসে বলে ধারণা করা হয়। কেননা ভোলা জেলার দক্ষিণে এখনো চর পড়ে।

হিমালয় থেকে বয়ে আসা  মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার সাথে অনেকে ব্রহ্মপুত্র নদী বিধৌত পলিমাটির কথা বলেছেন সুরম্য এ ব-দ্বীপ গড়ে উঠার বিষয়ে। আবার কেউ কেউ এরসাথে যমুনা ও পদ্মা নদীর কথা বলেছেন। তবে হিমালয় থেকে নেমে আসা তিনটি প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র বাহিত পলি জমে মোহনায় দ্বীপ গড়ে ওঠেছে বলে ভোলা জেলার ইতিহাস গ্রন্থ ও অন্যান্য তথ্য থেকে জানা যায়। নৃতত্ত্ববিদ ও ভূতত্ত্ববিদরা মনে করেন, পূর্বে মেঘনা আর পশ্চিমে তেঁতুলিয়া নদী বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এসে গতিবেগ হারিয়ে ফেলে। যার ফলে মোহনায় পলি ও বর্জ্য জমে দ্বীপের জন্ম হয়।
.
দ্বীপটির জন্ম বেশিদিন হয়নি। আনুমানিক ১২৩৫ সাল থেকে চর পড়া শুরু হয়ে দ্বীপ জেগে ওঠে এবং ১৩০০ সাল থেকে চাষাবাদ ও বসবাস শুরু হয়। জে. সি. জ্যাক বাকেরগঞ্জ গেজেটিয়ারে এমনটাই উল্লেখ করেন। দ্বীপটি গড়ে ওঠার পর এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বেতুয়া নদী। যা কালক্রমে বিলীন হয়ে গেছে। বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলা। এটি বৃহত্তম প্রাচীন গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ। দ্বীপটি গাঙ্গের অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত। এর গড় উচ্চতা সমুদ্র তল থেকে ১২ ফুটের মতো। ভোলা জেলার আয়তন ৩,৪০৩.৪৮ বর্গ কিলোমিটার। ১৮৫৪ সালে দ্বীপটি মহকুমায় উন্নীত হয়। ১৯৮৪ সালে মহকুমা থেকে জেলার মর্যাদা পায়। প্রাচীনকালে মুঘল পূর্ব যুগে দ্বীপটি চন্দ্রদ্বীপ নামক রাজ্যের শাসনে ছিল।
.
দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত আব্দুর রাজ্জাকের তথ্যমতে, ‘প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে একটি ক্ষুদ্র জনপদ চন্দ্রদ্বীপ। এর অবস্থান ছিল বলেশ্বর ও মেঘনা নদীর মধ্যবর্তী স্থানে। বর্তমান বরিশাল জেলাই ছিল চন্দ্রদ্বীপের মূল ভূখণ্ড। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় মুসলিম আধিপত্য বিস্তারকালে রাজা দনুজমর্দন ‘চন্দ্রদ্বীপ’ নামের একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত রাজ্যটি চন্দ্রদ্বীপ নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করে। চন্দ্রদ্বীপ নামের আগে এ অঞ্চলটির নাম ছিল ‘বাকলা’। তাই একপর্যায়ে অঞ্চলটি বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ নামে পরিচিতি পায়। ১৭৯৬ সাল পর্যন্ত অঞ্চলটি বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ নামেই পরিচিত ছিল। ১৭৯৭ সালে ঢাকা জেলার দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে বাকেরগঞ্জ জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮০১ সালে জেলার সদর দপ্তর বাকেরগঞ্জ জেলাকে বরিশালে স্থানান্তর করা হয়। পরে বাকেরগঞ্জ নামে একটি উপজেলা ঘোষণা করা।’
.
চন্দ্রদ্বীপের রাজা জয়দেবের মৃত্যুর পর তার কন্যা কমলা ১৪৯০ সালে সিংহাসনে আরোহন করেন। তিনি তেঁতুলিয়া নদীর পূর্ব ও পশ্চিম পাশে দুটি দিঘি খনন করেন। পশ্চিম পাড়ের দিঘি কমলা রানির নামে নামকরণ করা হয়। আর পূর্ব পারের দিঘি তার বোন বিদ্যা সুন্দরীর নামে নামকরণ করা হয়। দিঘি দুটির অবস্থান কমলা রানির দিঘি পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার কালাইয়া গ্রামে আর বিদ্যা সুন্দরীর দিঘি ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলা গ্রামে। বাংলার প্রাচীন জনপদ বা রাজ্য চন্দ্রদ্বীপের মধ্যেই ছিল ভোলা এতে কোনো সন্দেহ নেই।
.
শুরুতে দ্বীপটির কোনো নাম ছিল কিনা জানা যায়নি। তবে চর বা দ্বীপ নামে পরিচিত ছিল। গাঙ্গের বুকে জেগে ওঠা এ দ্বীপের বাসিন্দাদের জানমালের নিরাপত্তা ছিল না। জলদস্যু আক্রমণ করতো। এটা ছিল জলদস্যুর অভয়ারণ্য। মোগল সম্রাট আকবরের নিযুক্ত সুবেদার ও সেনাপতি শাহবাজ খান জলদস্যুর কবল থেকে এ অঞ্চলের মানুষকে মুক্ত করার জন্য ১৫৮৩ সালে এখানে আসেন। সেই থেকে এ অঞ্চলের নাম হয় দক্ষিণ শাহবাজপুর। পরে কালক্রমে সেই আদি নাম পাল্টে নামকরণ করা হয় ভোলা। এভাবে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ তথা দ্বীপ জেলা ভোলা সৃষ্টি হলো।
.
লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট। লালমোহন, ভোলা। nurulamin911@gmail.com. 01759648626.
Next Barisal banner ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *