হঠাৎ ছুটিতে

এ.এম.তাহিরা বিনতে নূর:
দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা শেষ । প্রায় নয় দিন ছুটি। আম্মু বলেছে দুদিন পড়তে হবে না । আবার অনেকদিন হলো কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না। সবাই বলছে ঘুরতে যাব । কিন্তু কোথায় যাব।
দুইটি জায়গায় আছে। হয় রাজবাড়ী । না হয় ঢাকা। দুইটাতেই যাওয়া যায় । রাজবাড়ি কাছে। ট্রেন দিয়ে সহজে যাওয়া যায় । আবার আমি কখনো ঢাকা যাইনি । ঢাকা গেলে আবার নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারব । কেউই ঠিক করতে পারছিল না । কোথায় যাব । আমরা ঠিক করলাম। আমরা দুই তারিখ রাতে রওনা দিব।

আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা ঢাকা যাব। কারণ আমি কখনো ঢাকায় যাইনি। আবার পদ্মা সেতুর কারণে পথ এখন সহজ। কিন্তু দুই তারিখ রাতে গেলে, তিন তারিখ রাতের মধ্যে ফরিদপুর ফিরতে হবে। তবুও একদিন ঘুরতে পারবো। আমরা দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে ফেললা। রাতে আমার একটুও ঘুম হয়নি। ভাইয়ারও ঘুম হয়নি। ফজরের আযান শুনে আমি সবাইকে জাগিয়ে তুললাম । আম্মু বলেছে আমাদের সঙ্গে যাবে না। কি আর করা! আমরা তিনজন যাব । আব্বু , ভাইয়া ও আমি । ফজরের নামাজ পড়ে তৈরি হলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। আমাদের ঢাকার যাত্রা শুরু হল। আমরা ভোর সাড়ে ছয়টার বাসে উঠলাম। কিন্তু বাস ১৫ মিনিট দেরি করে ছাড়লো। তারপর দুই ঘণ্টার মধ্যেই আমরা ঢাকা চলে এলাম। নয়টার সময় বাস গুলিস্তানে এসে পৌঁছালো। পাশে একটি হোটেল থেকে আমরা সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। তারপর আমরা সিএনজিতে উঠলাম। সিএনজি সামরিক জাদুঘরের সামনে থামল। আমরা ৯:৩০ মিনিটের মধ্যে সামরিক জাদুঘরের টিকিট কাউন্টারে পৌঁছালাম। কিন্তু টিকিট দেয়া শুরু হবে সকাল ১০ টা থেকে। কি আর করা। আমরা অপেক্ষা করতে থাকলা। সময় যেন শেষ হয় না। অবশেষে দশটা বাজলে আমরা টিকিট নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম। টিকিট পেয়ে আমরা খুব খুশি। প্রথমে ওয়াশরুমে যেয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। ওয়াশ রুমটা বিদেশের মতো। তারপর ভালো করে জাদুকরটা ঘুরলাম। চলমান সিঁড়িতে উঠলাম। কিন্তু চলমান সিঁড়িতে উঠতে আমার ভয় লেগেছিল। আমরা জাদুঘরে অনেক কিছু দেখলাম। সেখানে আর্মিদের অনেক পুতুল ছিল। আমরা আরো দেখলাম বাংলাদেশের মানচিত্র। আবার একটি চলমান সিঁড়িতে কৃত্রিম ঝর্ণা ছিল। পুরো জাদুঘরটা খুব পরিষ্কার। চারিদিকে ছোট বড় অনেক টাচ স্ক্রিন লাগানো। আমরা আরো দেখলাম বাংলাদেশের অনেক ক্রেস্ট । বাইরে দিয়ে জাদুঘরটি দেখতে কিছুটা ছোট হলেও ভিতরে কিন্তু জাদুঘরটি দেখতে অনেক বড়। কারণ মাটির নিচে অর্থাৎ আন্ডার গ্রাউন্ডে জাদুঘরটির দুই টি তলা অবস্থিত। পুরো জাদুঘরটি ঘুরতে আমাদের প্রায় দুই থেকে তিন ঘন্টা লেগে যায়। তারপর আমাদের মনে পড়ে রাত্রিবেলা ছোট চাচ্চুর সাথে কথা হয়েছিল। আমরা ঢাকায় পৌঁছেছি সে কথা চাচ্চুকে জানাতেই চাচ্চু বলে বসলো ” আমার এখানে একরাত কাটাতে হবে।”
সুতরাং চাচ্চুর ওখানে যেতে হবে তাই এবারের মতো সামরিক জাদুঘরকে বিদায় জানালাম।
বাস অথবা সি এন জির জন্যে আমরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। অপেক্ষা করতে করতে ধৈর্য হারিয়ে ফেললাম। না, বাসও আসেনা। সিএনজিও আসেনা। অবশেষে এগারো নম্বর গাড়িতে অর্থাৎ পায়ে হেঁটে বিজয় সরণি পার হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে এসে পৌঁছলাম। তারপর একজন ট্রাফিক পুলিশের সাথে দেখা। তিনি আমাদের একটি বাসে উঠিয়ে দেন। কিন্তু আমরা যখন জানতে পারি এ বাস আমাদের শেষ গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছাবেনা, তখন আমরা তড়িগড়ি করে বাস থেকে নেমে পড়ি। আমরা আবার হাঁটতে থাকি। খুব কষ্ট করে আমরা একটা সিএনজি পাই। যাক একটু শান্তি পেলাম। তারপর সিএনজি বিশ্বরোডে থামলো। সেখানেই চাচ্চু ও চাচী মা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। তারপর চাচ্চুর মাদ্রাসায় নিয়ে গেল আমাদের। সেখানে গিয়ে আমরা বিশ্রাম নিলাম। চাচ্চু আমাদের জন্য খাবার নিয়ে এলেন। এই প্রথম বোর্ডিং এর খাবার খেলাম আমি। কিন্তু খেতে খুব ভালো লেগেছে। মুরগির মাংস, ডাল ভাজি ও আমার চাচা আমাদের জন্য ভর্তা নিয়ে এলো। খুব ভালো লেগেছে। যেন সাতটা এখনো মুখে লেগে আছে। তারপর দুপুর বেলায় আমরা বিশ্রাম করি। তারপর বিকাল বেলা আব্বুর বন্ধু, আব্বুর সাথে দেখা করতে আসে। তিনি আমাদের জন্য চাপ ও নান আনে। ওটা খাওয়ার পরে রাতের খাবার কেউ খেতে পারিনি। তাই আমরা অনেক পরে রাতের খাবার খাই। রাতে চাচ্চু আমাদেরকে ছাদে নিয়ে তার লাগানো ড্রাগনফল গাছ দেখায়। তাই রাতে ঘুমাতে দেরি হয়। সকালবেলা চাচ্চু আমাদের জন্য নিহারি ও নান আনেন। তারপরে সকাল বেলা আমি বসে বসে সামরিক জাদুঘরের ছবিগুলো দেখছিলাম। তারপর আমরা তৈরি হচ্ছিলাম জলসিড়ি পার্কে যাওয়ার জন্য। তখন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। আমরা ভেবেছিলাম আজ মনে হয় পার্কে যেতে পারবো না। সকলেরই মন খারাপ। তবে বৃষ্টি যখন একটু কমে আসে তখন আমরা আমাদের যাত্রা শুরু করি। প্রথমে আমরা রিকশায় উঠলাম। রিকশা দিয়ে আমরা বাসস্ট্যান্ডে গেলাম। তারপর বাসে উঠলাম। বাস থেকে চারপাশের পরিবেশ গুলো দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল। চারদিকে কাশফুল আর কাশফুল। তারপর বাস থামল জলসিড়িতে। নেমে আমরা অটোরিকশায় উঠলাম। অটোতে করেই আমরা পার্কে যাব। অটো থেকে ও চারপাশের দৃশ্য দেখতে খুব ভালো লাগছে।চাচি মা ভিডিও করছে। চারদিকে কাশফুল আর কাশফুল। কিছু দূর সামনে এগিয়ে দেখতে পেলাম শেখ রাসেল ক্যান্টনমেন্ট কলেজ। নয়নাভিরাম দৃশ্য। ক্যাম্পাসটি বাইরে থেকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছিল। অবশেষে আমরা চলে এলাম পার্কের কাউন্টারের সামনে। একজন মিলিটারি কাউন্টারে দাঁড়িয়ে। আরেকজন মিলিটারি বাইরে দেখভাল করছেন। মাঝে মাঝে হ্যান্ড মাইকে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। টিকিট কেটে আমরা পার্কের ভিতর প্রবেশ করলাম। পার্কটা দেখে আমাদের মন জুড়িয়ে গেল। যেন প্রকৃতির ছোঁয়া। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ। গাছপালা আর ঘাস। সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এ পার্কের সর্বত্রই এক পরিচ্ছন্নতার আভাস নজরে পড়ে। এক পাশে আছে বাচ্চাদের জন্য কিছু খেলনা। যেমন স্লিপার, দোলনা ইত্যাদি। সেখানে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে গোলক ধাঁধা। বনসাই করে এটি তৈরি করা হয়েছে। চাচিমা আমাদের জন্যে খেজুর ও পাউরুটি এনেছিল। আমরা সবাই মিলে ভাগাভাগি করে খেয়ে নিলাম। অনেকক্ষণ দৌড়াদৌড়ি ও লাফালাফি করেছিলাম ,তাই একটু ক্ষুধাও পেয়েছিল। তাছাড়া পাউরুটি আমার ফেবারিট খাবারের অন্যতম।

খাওয়ার পরে আমরা স্মৃতি রক্ষার্থে কিছু ছবি তুললাম। আল্লাহ্ পাকের অশেষ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলাম। জোহর নামাযের ওয়াক্ত হলো অজু করে নামাজ ঘরে চাচিমা ও আমি নামাজ আদায় করলাম। আব্বু, চাচ্চু ও ভাইয়া পাশেই পুরুষের নামাজ আদায় করলেন।

এবার বিদায়ের পালা। বিদায়ের আগে জলসিড়ি কৃত্রিম ঝর্ণা দেখে আমরা বিমোহিত হলাম।
আলহামদুলিল্লাহ ,কতইনা সুন্দর একটি দিন কেটে গেল! এবার সিএনজি যোগে পার্ক থেকে রওয়ানা করলাম নীলা মার্কেটের দিকে।


এখানে গিয়ে চাচ্চুর সৌজন্যে মুছা মীর জামাই বউয়ের হোটেলে হাঁসের গোশত, ছোট মাছ ,ডাল আর নানান রকম ভর্তা দিয়ে দুপুরের খাবারটা বেশ আয়েশ করে খেলাম। আলহামদুলিল্লাহ।
চাচ্চু আমাদেরকে বাসায় আনার একটি বালিশ মিষ্টি কিনে দিল। চাচ্চু ও চাচিমা আমাদের সাথে বিশ্বরোড পর্যন্ত এলো। এবার আমাদেরকে গুলিস্তানের গাড়িতে তুলে দিয়ে চাচ্চু ও চাচিমা আল্লাহ হাফেজ ফি আমানিল্লাহ বলে বিদায় নিলেন। আলহামদুলিল্লাহ রাত আটটার মধ্যে আমরা বাসায় পৌছেগেলাম। আম্মুকে ছাড়া এই প্রথম আমাদের বেড়াতে যাওয়া। আম্মু আমাদের দেখে বেজায় খুশি হলেন।

এ.এম.তাহিরা বিনতে নূর
তৃতীয় শ্রেণি
পুলিশ লাইন্স স্কুল এন্ড কলেজ, ফরিদপুর।

Next Barisal banner ads

৭ comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.