মান সম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষায় চাই স্বতন্ত্র ক্যাডার

ইরতেজাউর রহমান খান (পরশ) ।।
২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের এক প্রশ্নোত্তর পর্বে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মোঃ ফরহাদ হোসেন স্ট্যাটিসটিকস অব সিভিল অফিসার্স অ্যান্ড স্টাফ -২০২১ (প্রকাশিত জুন-২০২২) প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলেন- দেশে সরকারি চাকুরিজীবীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষ ৫৪ হাজার ৯২৭। এদের মধ্যে নারী ৪ লক্ষ ৪ হাজার ৫৯১ জন এবং পুরুষ ১১ লক্ষ ৫০ হাজার ৩৩৬ জন। সরকারি চাকরিজীবীদের এই সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১% এরও কম।
এদের মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৪ লক্ষ ৪৩ হাজার শিক্ষক সহ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সংখ্যা প্রায় ৪ লক্ষ ৭৭ হাজার ১২৫ জন। অর্থাৎ দেশের মোট সরকারি চাকুরিজীবীদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশই প্রাথমিকে কর্মরত। বর্তমান চাকরির বাজারে সরকারি চাকুরি সোনার হরিণ। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এক জরিপে উঠে এসেছে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে ৩৩.২ শতাংশ বেকার। লক্ষ লক্ষ উচ্চ শিক্ষিত বেকার যুবকরা তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই নিম্ন ধাপের বেতন গ্রেড সত্বেও প্রাথমিকে যোগদান করছেন। বিগত এক যুগে প্রাথমিকে ২ লক্ষ ৩৮ হাজার শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। সরকার প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। সরকারের নানা সাফল্যের পরেও এটা স্বীকার করতে হবে যে প্রাথমিক শিক্ষায় নীতি নির্ধারনসহ সব পর্যায়ে প্রয়োজন প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করা অভিজ্ঞ ও  দক্ষ জনবল। এজন্য প্রয়োজন স্বতন্ত্র প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার সার্ভিস।
পাবলিক সার্ভিস কমিশন বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে ২৬টি ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োগের সুপারিশ করে থাকে।কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো প্রায় ১০ লক্ষ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ২৬ টি ক্যাডার থাকলেও ৫ লক্ষ প্রাথমিক শিক্ষার জনবলের জন্য স্বতন্ত্র কোন ক্যাডার নেই। প্রাথমিক শিক্ষা চলছে ধার করা ক্যাডারে। আর নিজস্ব ক্যাডার না থাকায় তেমন কোন পদন্নোতিরও সুযোগ নেই প্রাথমিক শিক্ষকদের। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক শিক্ষায় আসছেন না। যারা আসেন তারাও প্রাথমিক শিক্ষায় থাকতে চান না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন পশু পাখির জন্য আছে প্রানি সম্পদ ক্যাডার, মাছের জন্য মৎস্য ক্যাডার, কৃষির জন্য কৃষি ক্যাডার। অথচ মানব সম্পদ অর্থাৎ যারা শিশুদের পড়ালেখার দায়িত্ব নিয়েছেন তাদের কোন ক্যাডার সার্ভিস নেই।
প্রাথমিক শিক্ষাকে একটি সুদৃঢ় কাঠামোতে আনার লক্ষ্যে ১৯৮৯ সালের জুলাইয়ে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার পদের কম্পোজিশন পুনবিন্যাস করে প্রাথমিক শিক্ষা, অধিদপ্তর ও মাঠ পর্যায় সংক্রান্ত ৩১৮ টি পদ অন্তর্ভুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। একই সঙ্গে এ পদ গুলোর জন্য বিসিএস নিয়োগ বিধিমালা -১৯৮১ সংশোধন করে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে ওই বছরই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে শিক্ষা অধিদপ্তরে ২৩টি, নেপ এ ৩৭টি ও মাঠ পর্যায়ে ২০৯ টি পদ রাখা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা বিভাগ নামে একটি স্বতন্ত্র বিভাগের সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক শিক্ষা সংক্রান্ত সকল দায়িত্ব এই বিভাগে অর্পণ করা হয়। ২০০০ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ নিয়ে পুর্নাঙ্গ মন্ত্রণালয় গঠন এবং বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মাঠ পর্যায়ের ক্যাডার পদগুলো পৃথকীকরণের জন্য তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নামে পুর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় গঠন করা হলেও প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার আজও গঠন হয়নি।
প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডারের পদগুলো বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) এর আওতায় থেকে যায়। পরবর্তীতে পিইডিপি-২ এর আওতায় ২০০৬ সালে বিসিএস (প্রাথমিক শিক্ষা) ক্যাডার গঠনের সারসংক্ষেপ প্রেরণ করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষার বিশাল কর্মপরিধি ও জনবলের বিস্তৃতি এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা অন্যান্য ক্যাডারের তুলনায় অনেক বেশি। ২০৩০ সালে এসডিজির ৪নং লক্ষ্য মান সম্পন্ন  শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রাথমিকের ভিত্তি মজবুত করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় ১ম শ্রেণির ২৫৪১ টি পদ থাকা সত্বেও স্বতন্ত্র কোন ক্যাডার নেই। অথচ কোন কোন ক্যাডারে সদস্য সংখ্যা ২০০ এরও কম। প্রাথমিকে নিজস্ব ক্যাডার না থাকায় অন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তাকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কিত দেশি ও বিদেশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলার পর প্রেষণ শেষে অন্যত্র গমন ও পদায়নের ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় তাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কোন কাজে আসে না।
অপরদিকে প্রাথমিক শিক্ষায় সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ক্যাডারের সদস্য না হওয়ায় তাদের পদন্নোতির সুযোগ নেই বললেই চলে। ফলে অধিকাংশ যেই পদে চাকরি শুরু করেন সেই পদেই চাকরি শেষ করেন। ফলে মান সম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কাঙ্খিত অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। প্রাথমিক শিক্ষার বিশাল কর্মপরিধিতে বিসিএস (প্রাথমিক শিক্ষা) ক্যাডার গঠিত হলে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের মনোবল বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যতে উচ্চ শিক্ষিত, প্রতিভাবান, মেধাবীরা এই সেক্টরে যোগদানে উৎসাহিত হবেন। ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ইরতেজাউর রহমান খান (পরশ)
প্রধান শিক্ষক,  ১৫২নং বিহারিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাকেরগঞ্জ, বরিশাল। 
২০২৩ সালে প্রাথমিকে বরিশাল বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক
Next Barisal banner ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *